বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
জাতীয়

নতুন আইন কার্যকর

অনলাইন জুয়ায় সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা

দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন রোধে যুগোপযোগী নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। প্রায় ১৫৯ বছর আগের ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ রহিত করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ নামে নতুন এই আইন কার্যকর করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বুধবার (১ জুলাই) আইনটি জারি করে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আইনটি দেশব্যাপী কার্যকর হয়েছে।

নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস (MFS) অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো ডিজিটাল অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

অপরাধের ধরন ও শাস্তির বিধান
নতুন আইনে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে:

সাধারণ জুয়া: সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড।

অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া: সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা।

অনলাইন বেটিং ও নেটওয়ার্ক পরিচালনা: ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা কিংবা বুকমেকার হিসেবে কাজ করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।

ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিং: ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট মেয়াদে বা স্থায়ীভাবে খেলাধুলা থেকে নিষিদ্ধ করতে পারবেন আদালত।

বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা: জুয়ার বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ বা ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে জুয়ার প্রসারে অংশ নিলে গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী বা খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।

ঘোস্ট সিম ও ভুয়া এমএফএস: অন্যের এনআইডি বা বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। তবে এটি সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে হলে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা জরিমানা হবে।

মানি লন্ডারিংয়ের আওতাভুক্ত: জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর বা বৈধ করার চেষ্টাকে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’-এর সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate Offense) হিসেবে গণ্য করে বিচার করা হবে।

নতুন আইনে আদালতকে অপরাধে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম এবং ডিভাইসসহ সব ধরনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জুয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত ভবন, অফিস বা কল সেন্টারও বাজেয়াপ্ত করা যাবে।

কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা পেমেন্ট গেটওয়ে এই অপরাধে জড়িত থাকলে তার পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়ী হবেন এবং প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা যাবে।

অনলাইন ও সাইবার স্পেসের অপরাধগুলোর বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্যান্য অপরাধের বিচার হবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী।

এই আইনের সব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য।

সাব-ইন্সপেক্টর (SI) পদমর্যাদার নিচে নন, এমন পুলিশ কর্মকর্তা এর তদন্ত করবেন এবং আদালতের অনুমতি নিয়ে সাময়িকভাবে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারবেন।

আইন বাস্তবায়নে সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (DPI), ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবস্থা চালু করা হবে।

স্বরাষ্ট্র, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক (বিএফআইইউ), সিআইডি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে এই আইন বাস্তবায়নে কাজ করবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত পাবলিক গ্যামলিং এ্যাক্ট, ১৮৬৭ আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হলো। তবে পূর্ববর্তী আইনের অধীনে চলমান মামলা ও কার্যক্রম নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে।

 

 

সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ