জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষ দল-মত ভুলে রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং তাদের সেই ত্যাগকে যথাযথ সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির নয়; এটি দেশের সব মানুষের সম্মিলিত অর্জন।
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত 'জুলাই জাতীয় সম্মেলনে' প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জুলাইতে এত মানুষ জীবন দিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল এ দেশের শাসনব্যবস্থা ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন। যারা মানুষ হত্যা করেছে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে।”
বিচারের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “স্বৈরাচার যেমন বিচারের নামে অবিচার করেছে, আমরা যেন বিচারের নামে কোনো অন্যায় না করি। সেদিকে কঠোরভাবে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে কিছুটা সময় লাগবে, তবুও আইন অনুযায়ী যেন সঠিক ও নিখুঁত বিচার হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে যেখানে প্রতিটি মানুষ তার ন্যায্য অধিকার ও সম্মান পাবে এবং রাষ্ট্র সবার জন্য নিরাপদ হবে।
“জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেশকে কখনোই এগিয়ে নেওয়া যায় না। যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন, তাদের সবাইকে দেশ ঐক্যবদ্ধ রাখতে এগিয়ে আসতে হবে।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে নিজের পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিগত ১৭ বছরের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে আবেগঘন কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যদি মাকে (বেগম খালেদা জিয়া) জিজ্ঞেস করতে পারতাম— মা, আপনার ওপর ১৭ বছর যে অন্যায়-জুলুম এবং মানসিক নির্যাতন হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কি এখন প্রতিশোধ নেব? মা নিশ্চয়ই বলতেন, প্রতিহিংসা নয়, তোমার দায়িত্ব সকলকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমার প্রয়াত ভাইও একই কথা বলতো।”
দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ে সহযোদ্ধাদের হারানোর বেদনা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “১৭ বছর আগে যাদের সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম, তাদের অনেককেই আমরা হারিয়েছি। কারও কারও অঙ্গহানি হয়েছে। শারীরিক কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণা আমিও গভীরভাবে অনুভব করি।”

এর আগে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সন্তান হারানো মায়ের কান্না, বাবার দীর্ঘশ্বাস, ভাইয়ের আহাজারি আর আহত যোদ্ধাদের বেদনায় আজ ভারী হয়ে ওঠে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ২ বছর পর অনুষ্ঠিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।
জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের না-বলা কষ্ট, দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। অনেকেই বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।
সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। মঞ্চের ব্যানারে লেখা, ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা; ৪ জুলাইয়ের এই দিন হোক সবার অনুপ্রেরণা; যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’
সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন। এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুল রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, আহত জুলাই যোদ্ধা আল মিরাজ এবং জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত অন্য পরিবারগুলোর কাছেও স্মারক পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেও একটি স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত গড়ে ওঠে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন। পরে তা সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।
সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪। তবে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।