রাঙামাটিতে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে তীব্র ফ্ল্যাশ ফ্লাড (আকস্মিক বন্যা) এবং পাহাড় ধসের মারাত্মক ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এমন চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে ব্যাপক প্রস্তুতি ও উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (আনসার ও ভিডিপি)।
দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হওয়ার শুরুতেই, গত ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে রাঙামাটি জেলা কমান্ড্যান্টের কার্যালয়ে উপজেলা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাতাভোগী ও স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি পাহাড়ি ঢালু ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতা ও উদ্ধার অভিযান
ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার কয়েকদিন পূর্ব থেকেই স্থানীয় প্রশাসন ও উপজেলা কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় আনসার-ভিডিপির তৃণমূল সদস্যরা দল বেঁধে পাহাড়ি জনপদগুলোতে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালান। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে পাহাড় ধসের ভয়াবহতা বুঝিয়ে মানুষকে নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।
বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে মাঠপর্যায়ে কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দেয় আনসার ও ভিডিপি। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে নিবিড় সমন্বয় করে কর্দমাক্ত পথ ও ঝোড়ো হাওয়া মাড়িয়ে দুর্গম পাহাড়ের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে আনার কাজ শুরু করেন বাহিনীর সদস্যরা। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের পিঠে করে কিংবা হাত ধরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার মানবিক চিত্র দেখা গেছে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে। মাঠপর্যায়ের এই উদ্ধার অভিযানকে গতিশীল রাখতে উপজেলা কর্মকর্তারা নিয়মিত বিরতিতে জরুরি ব্রিফিং ও বৈঠক করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আশ্রয়কেন্দ্রে জোরদার নিরাপত্তা
গত ১০ জুলাই ২০২৬ বিকেল ৫টায় দেশের সব জেলা প্রশাসকদের সাথে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেন এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনার আলোকেই রাঙামাটি জেলা সদরের প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষ যাতে আতঙ্কিত না হয় এবং পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত নিরাপদেই অবস্থান করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা সেখানে দিনরাত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিপন্ন মানুষের পাশে থেকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেই রাত জাগছেন বাহিনীর সদস্যরা।
"প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন ক্ষণে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং একটি প্রাণও যেন অকালে ঝরে না যায়, সেই লক্ষ্যেই দিনরাত অবিচলভাবে লড়াই করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।"
শেষ মুহূর্তের প্রচেষ্টা ও বিশেষ টিম গঠন
তীব্র দুর্যোগের মধ্যেও যারা নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে আসতে দ্বিধাবোধ করছেন, তাদের জীবন বাঁচাতে শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালাচ্ছেন আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা। কাঁধে হ্যান্ড মাইক নিয়ে তারা ছুটে যাচ্ছেন পাহাড়ের পাদদেশে থাকা প্রতিটি ঘরে ঘরে।
যেকোনো ধরনের জরুরি ও আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘আনসার ব্যাটালিয়ন’-এর একটি বিশেষ দক্ষ টিমকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে যৌথ টহল, উদ্ধার অভিযান কিংবা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই বিশেষ টিমটি ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে কাজ করবে।
মহাপরিচালকের আহ্বান ও কঠোর তদারকি
রাঙামাটিসহ দেশের সব বন্যা কবলিত এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মহোদয় স্পষ্ট আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে তাদের সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে দুর্গত মানুষের উদ্ধার, সতর্কীকরণ এবং সর্বাত্মক সহায়তা করার আদেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যাটালিয়ন পরিচালক, জেলা কমান্ড্যান্ট এবং উপজেলা কর্মকর্তারা নিজেরা সরাসরি উপদ্রুত এলাকায় উপস্থিত থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি ও সমন্বয় বজায় রাখছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মানবিক নির্দেশনা এবং বাহিনীর মহাপরিচালকের আন্তরিক আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে, নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিটি স্তরের সদস্য এখন একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন।