জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যের উপর কার্যকর করারোপ ও মূল্য বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে ইকোনমিক রিপোর্টারস ফোরাম।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকালে ইআরএফ কার্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দি রুরাল পুওর-ডব়্প ও ইকোনমিক রিপোর্টারস ফোরাম যৌথ আয়োজিত ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এই দাবি জানানো হয়েছে।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এমপি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট হুমকি। এই স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষতি কমাতে তামাকপণ্যের দাম কেবল বাড়ালেই হবে না, বরং তা অবশ্যই মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় বেশি হতে হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব (মূসক নীতি) মোঃ মশিউর রহমান। তিনি বলেন, তামাক পণ্যের বর্তমান কর কাঠামোর কারণে সরকার বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে। এই বিশাল অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। কার্যকর তামাক কর এমন একটি শক্তিশালী নীতি যা বাস্তবায়ন করলে ধূমপান কমবে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে এবং একইসাথে সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাজারে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ, ও অতি উচ্চ- এই চার স্তরের সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। সিগারেট বিক্রির সিংহভাগ প্রায় ৯০% নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের দখলে রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাথাপিছু সিগারেট বিক্রি বিগত বছরগুলোতে প্রায় একইরকম থাকলেও এই দুই স্তরে সিগারেট বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। আসন্ন অর্থবছরে নিম্ন ও মধ্যম- এই দুটি স্তরকে একত্রিত করে এই নতুন তিন স্তরের সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম যথাক্রমে ১০০ টাকা, ১৫০ টাকা, ও ২০০ টাকা নির্ধারণ এবং সকল স্তরে ৬৭% সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে ইকোনমিক রিপোর্টারস ফোরামের সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, বাজেটের আগে তামাকের কর ও দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে কোম্পানিগুলো 'চোরাচালান বাড়বে' বলে যে প্রচারণা চালায়, তা একটি ভিত্তিহীন গুজব। বাস্তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের দাম অনেক কম হওয়ায় চোরাচালানের কোনো সুযোগ নেই। তামাক কোম্পানিগুলোর এমন কূটকৌশল, রাজস্ব ক্ষতির ভয় এবং জাল পণ্যের গুজব প্রতিরোধে ইকোনমিক রিপোর্টারস ফোরাম সংবাদমাধ্যমে সবসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করবে।
সাবেক সচিব মোঃ আজহার আলী তালুকদার বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি (৩৫.৩ শতাংশ)। তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। ২০২৪ সালে তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এই খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের (৪০ হাজার কোটি টাকা) দ্বিগুণের বেশি। এই ক্ষতি কমাতে তামাকখাতকে কেবল রাজস্ব আয়ের চশমা দিয়ে না দেখে কার্যকর করারোপের মাধ্যমে তামাকপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ডব়্প-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এএইচএম নোমান। তিনি বলেন, তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধির এই প্রস্তাবনা আগামী বাজেটে প্রতিফলিত করা গেলে ৩ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজারের বেশি তরুণ জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।
কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন ইকোনমিক রিপোর্টারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। আরও উপস্থিত ছিলেন, বিসিআইসি-এর সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, ডব়্প তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রতিনিধি জেবা আফরোজা সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।