মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
জাতীয়

৬ মাসের মধ্যে রাজধানীর ১২০ মোড়ে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল: ডিএমপি

রাজধানীর যানজট নিরসন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এর অংশ হিসেবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীর ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১২টি পয়েন্টে এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও, আগামী এক মাসের মধ্যে তা ৬০টি পয়েন্ট ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে ট্রাফিক বিভাগ।

সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জনবল সংকটের কথা তুলে ধরে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জানান, ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ১০০ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন। তবে ছুটি, প্রশিক্ষণ ও অসুস্থতার কারণে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ সদস্য রাজধানীর ৬৬৮টি ট্রাফিক পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি পয়েন্টে তিন পালায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এবং বাকি অধিকাংশ পয়েন্টে দুই পালায় দায়িত্ব পালন করতে হয় ট্রাফিক সদস্যদের।

প্রকৌশলগত পরিবর্তন ও ডাইভারশনের ইতিবাচক ফল
সীমিত জনবল নিয়েও রাজধানীর যানজট সহনীয় পর্যায়ে রাখতে গত প্রায় এক বছরে নগরীর ৭৫টি পয়েন্টে সড়ক ডাইভারশন এবং প্রকৌশলগত মডিফিকেশন আনা হয়েছে। কোথাও সড়কের গতিপথে পরিবর্তন আনা হয়েছে, আবার কোথাও নতুন ডাইভারশন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জানান, এসব পরিবর্তনের ফলে এখন পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের যানজট বা নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া যায়নি; বরং মাঠপর্যায়ে যানজট কমার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মিলেছে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে আসাদ গেটের ওপাশে চার রাস্তার মোড়ে আগে প্রায়ই তীব্র যানজট লেগে থাকত এবং অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েন রাখতে হতো। পরে ওই মোড়ে সরাসরি চলাচল বন্ধ করে বাম দিকে ঘুরিয়ে অল্প দূরে ইউটার্নের ব্যবস্থা করা হয়। এতে বাম লেন সব সময় সচল থাকে এবং যানবাহনের চাকা থেমে থাকে না। কেবল এই একটি জংশনেই ৮ জন পর্যন্ত ট্রাফিক সদস্য কমানো সম্ভব হয়েছে।

একই ধরনের ডাইভারশন ও প্রকৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে মোহাম্মদপুরের বসিলা, বনানীর কাকলী, মিরপুরের ইসিবি চত্বর এবং কালশী ফ্লাইওভারের নিচেও। আনিছুর রহমান বলেন, ঢাকা একটি অত্যন্ত জনবহুল মেগাসিটি। এখানে শুধু ট্রাফিক সদস্যের সংখ্যা বাড়িয়ে সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সড়কের নকশা বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ডাইভারশন ও মডিফিকেশন করা হলে তা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হয়। সামনে আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বর্তমান জনবল দিয়েই নগরবাসীকে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা
যানজটের সময় ও তীব্রতার বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পিক আওয়ার ও অফ-পিক আওয়ার বিবেচনায় সদস্য মোতায়েন করা হয়। তবে দীর্ঘ মেয়াদে শুধু ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যুক্ত করাই হবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, রাজধানীতে পর্যায়ক্রমে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। বর্তমান সিগন্যালগুলো ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও প্রয়োজন অনুযায়ী এর সময় পরিবর্তন করা সম্ভব। তবে উন্নত দেশগুলোতে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পুরো সিস্টেম পরিচালিত হয়, যেখানে একটি সিগন্যাল অন্যটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। নির্দিষ্ট সময়ে যানবাহনের চাপ বিবেচনা করে (যেমন—৪০, ৬০ বা ৮০ সেকেন্ড) সিগন্যালের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয় এবং পাশের জংশনগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করা হয়।

উন্নত দেশের মডেল পুরোপুরি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা সম্ভব না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, উন্নত দেশের সড়কগুলো অত্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত ও প্রকৌশলগতভাবে নির্মিত। মোড়ের কোণ, ঢাল বা বাঁক—সবই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থা শুরু থেকেই সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তা সত্ত্বেও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় সেমি-অটোমেটিক ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে পুরোপুরি অটোমেটিক ও জিপিএসভিত্তিক নজরদারির আওতায় ট্রাফিক ব্যবস্থা আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যার বাস্তবায়ন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল।

নাগরিক সহযোগিতা ও চলমান চ্যালেঞ্জ
বর্তমান ট্রাফিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আনিছুর রহমান বলেন, গত দুই মাসে নগরবাসীর কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সহযোগিতা পাওয়া গেছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন, সিগন্যাল অনুসরণ করছেন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখছেন। এর ফলে আগের মতো দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ঘটনা অনেকাংশে কমেছে।

তবে ঢাকার সব সমস্যার সমাধান যে এখনো হয়ে গেছে, তা মানতে নারাজ এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত হলেই এখনো অনেক সড়ক অচল হয়ে যায়। এ ছাড়া সড়ক অবরোধ করে মিছিল, মিটিং ও বিক্ষোভও যান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ঢাকার যানজটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; কারণ তেজগাঁওয়ের সমস্যা মতিঝিলকে এবং মিরপুরের সমস্যা ওয়ারীকেও প্রভাবিত করে। ভারী বৃষ্টির সময় অটোমেটিক সিস্টেম সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বিধায় তখন ম্যানুয়ালি সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

সমন্বয়ের অভাব ও অন্যান্য সমস্যা
যানজট নিরসনে শুধু ট্রাফিক পুলিশের একাই কিছু করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে আনিছুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা এবং সড়ক ব্যবহারকারী প্রতিটি মানুষেরই দায়িত্ব রয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। প্রায়ই দেখা যায়, কোনো ধরনের পূর্বযোগাযোগ বা সমন্বয় ছাড়াই বিভিন্ন সংস্থা রাতারাতি রাস্তা কেটে উন্নয়নকাজ শুরু করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় রাতের বেলায় রাস্তা কেটে রাখা হলেও দিনের বেলায় সেখানে কোনো কাজই হয় না, যা যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায়। আবার উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে অনেক সময় ট্রাফিক সিগন্যালের কেবল কেটে ফেলায় পুরো সিগন্যাল ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই টেকসই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

 

 

সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ