সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন-ভাতা কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুসারে, নতুন বেতনকাঠামোতে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়তি মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। এই অর্থ গত ৩০ জুন আহরিত বা প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামোর পরবর্তী ধাপ কার্যকর হবে। এ সময়ে নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে বেতন পাবেন।
২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর বেতন বৃদ্ধির পুরো অংশ বা শতভাগ কার্যকর হবে। যেহেতু নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে, তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ওই তারিখ থেকে প্রাপ্য বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থও পাবেন।
প্রজ্ঞাপনে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর অন্যান্য সব ধরনের ভাতা পাওয়া শুরু করবেন। একইভাবে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় যাবতীয় সুবিধা পাবেন।
নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। অন্যদিকে, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
এই প্রজ্ঞাপনে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এলাকা ও গ্রেড ভেদে বাড়ি ভাড়ার হারও নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চাকরি করা গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৫০ শতাংশ। গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৪৫ শতাংশ।
আর গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকার জন্য বাড়ি ভাড়ার হার কিছুটা কম। এসব এলাকায় গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন।
একই এলাকায় গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৪০ শতাংশ, গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৩৫ শতাংশ এবং গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা পাবেন মূল বেতনের ৩০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া।
অন্যান্য এলাকার জন্য গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৩৫ শতাংশ হারে।
এ ছাড়া গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা ৩০ শতাংশ এবং গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হলে ৬৫ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৫ হাজার ৬০০ টাকা বাড়িভাড়া পান চাকরিজীবীরা। ৯ হাজার ৭০১ টাকা থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল বেতন হলে ৬০ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৬ হাজার ৪০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।
মূল বেতন ১৬ হাজার ১ টাকা থেকে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হলে ৫৫ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৯ হাজার ৬০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। আর মূল বেতন ৩৫ হাজার ৫০১ টাকার বেশি হলে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫০ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ১৯ হাজার ৫০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।
অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রে বর্তমানে বাড়ি ভাড়ার হার ও ন্যূনতম অঙ্কে ভিন্নতা রয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন প্রজ্ঞাপন জারি হলো।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিই সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে এ বছরের ২১ জানুয়ারি। কমিশনপ্রধান সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান।
প্রজ্ঞাপন দেখতে এখানে ক্লিক করুন।