রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

দুই বিসিএসে সুপারিশ-তবু ৪৫তম বিসিএসের গেজেটে নেই সুমী আক্তারের নাম

মেধা, অধ্যবসায় আর দীর্ঘদিনের সাধনায় গড়ে তুলেছিলেন নিজের স্বপ্নের পথ। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বন ও পরিবেশবিদ্যা বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ৩.৮৮ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৯৯ অর্জন করেন সুমী আক্তার। 

পাঁচটি বিসিএসে অংশ নিয়ে দুটি বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তও হন তিনি। কিন্তু স্বামীর দাবি, ৪৫তম বিসিএসে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও গেজেটে নাম আসেনি সুমী আক্তারের। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, পরিবারের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

স্ত্রীর এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তাঁর স্বামী। ‘বিসিএস গেজেট প্রসঙ্গে’ শিরোনামে দেওয়া পোস্টে তিনি স্ত্রী সুমী আক্তারের দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, বিসিএসের প্রস্তুতি, সাফল্য এবং গেজেটে নাম না আসার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে একজন মেধাবী প্রার্থীর অনিশ্চয়তার পাশাপাশি একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও প্রত্যাশার গল্প।

সুমী আক্তারের শিক্ষাজীবনের ফলাফল বলছে, পড়াশোনায় ধারাবাহিক সাফল্য ছিল তাঁর। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ অর্জনের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪-এর মধ্যে ৩.৮৮ সিজিপিএ অর্জন করেন। স্নাতকোত্তরে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩.৯৯। এমন ফলাফল নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে এগিয়ে যান তিনি।

স্বামীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি বিসিএসে অংশ নিয়েছিলেন সুমী আক্তার। ৪১তম, ৪৩তম ও ৪৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তবে হাল ছাড়েননি। পরবর্তী সময়ে ৪৫তম বিসিএসে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে মেধাক্রমে ১১তম এবং ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে মেধাক্রমে ৬৭তম হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন বলে তাঁর স্বামী জানিয়েছেন।

একাধিক বিসিএসে অংশগ্রহণ, ধারাবাহিক প্রস্তুতি এবং শেষ পর্যন্ত দুটি বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার এই পথচলা তাঁর অধ্যবসায়ের পরিচয় বহন করে। তবে ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও গেজেটে নাম না থাকার বিষয়টি এখন তাঁর পরিবারের প্রধান উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘গেজেটে বাদ পড়েছে শুধু একটি নাম নয়, ভেঙে দেওয়া হয়েছে একটি পরিবারের সাত বছরের স্বপ্ন’

সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে সুমী আক্তারও তাঁর কষ্ট ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, দীর্ঘ সাত বছরের সাধনা, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, ব্যক্তিগত ত্যাগ আর বুকভরা স্বপ্নের পর রাষ্ট্রের গেজেটে নাম না থাকাটা তাঁর কাছে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং পরিবারকে ঘিরে গড়ে তোলা প্রত্যাশার ওপর বড় আঘাত।

পোস্টে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর অপরাধ কী? তিনি কি রাষ্ট্রের সেবা করার অযোগ্য? সাত বছরের পরিশ্রম, মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন কোথায়?

সুমী আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর এই পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধ মা-বাবা, যাঁরা সন্তানের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। একই সঙ্গে রয়েছে তাঁর পরিবার ও নয় মাসের শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ। চাকরিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানো এবং সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু গেজেটে নাম না আসায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সুমী আক্তার।

তিনি তাঁর পোস্টে স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি করুণা চান না; চান ন্যায়বিচার। তাঁর প্রতি নেওয়া সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং কোনো অভিযোগ থাকলে তার ন্যায্য মূল্যায়ন দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকলে সেই অন্যায়ের প্রতিকার হওয়া উচিত।

মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন

বিসিএস বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় অংশ নিতে প্রার্থীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবারের আর্থিক সহায়তা, ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। ফলে চূড়ান্ত সুপারিশের পরও গেজেটে নাম না থাকলে তার কারণ জানা এবং প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ পাওয়া সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুমী আক্তারের ঘটনা সেই প্রশ্নগুলোই সামনে নিয়ে এসেছে। একজন প্রার্থী যখন শিক্ষাজীবনে ভালো ফলাফল অর্জন করেন, একাধিক বিসিএসে অংশ নেন এবং দুটি বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হন, তখন তাঁর একটি গেজেটে নাম না থাকার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাখ্যা দাবি করে। তবে শিক্ষাগত ফলাফল ও সুপারিশপ্রাপ্তির তথ্য একা গেজেটে অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত যোগ্যতা বা সিদ্ধান্তের কারণ প্রমাণ করে না। বিষয়টি বুঝতে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, সরকারি নথি এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

সুমী আক্তারের স্বামীর বক্তব্য ও তাঁর নিজের ফেসবুক পোস্টে যে আক্ষেপ উঠে এসেছে, তা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বেদনার বিষয় নয়; এটি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্তের জবাবদিহি এবং প্রার্থীদের ন্যায়সংগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগের গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়।

কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা জরুরি

সুমী আক্তারের ৪৫তম বিসিএসের গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা জরুরি। একই সঙ্গে ৪৫তম বিসিএসে তাঁর সুপারিশের তথ্য ও গেজেটের অবস্থা সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যদি কোনো প্রশাসনিক বা বিধিগত কারণে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, তবে সেই কারণ সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে স্পষ্টভাবে জানানো উচিত। আর সিদ্ধান্তে কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী তা পর্যালোচনা ও প্রতিকারের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

একজন প্রার্থীর সাত বছরের শ্রমের মূল্যায়ন শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি ন্যায়সংগত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই সুমী আক্তারের দাবির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন।

সুমী আক্তার তাঁর পোস্টের শেষাংশে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা জানিয়ে বলেছেন, তিনি দয়া চান না—নিজের ন্যায্য অধিকার চান। তাঁর এই আকুতি এখন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও কেন তাঁর নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, আর সেই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

▐ সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ