বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা। সংবিধানের আলোকে রাষ্টের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, আর সেই দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ন্যায্য ও বৈজ্ঞানিক ওষুধ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার সম্প্রতি জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। গত ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পূর্বঘোষিত ২২ সদস্যের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অর্ন্তভুক্ত করে পরিষদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাজনীতিবিদ, আমলা, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদের কাছে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা জীবনরক্ষাকারী ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ন্যায্য মূল্যে পাওয়া নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ওষুধ শিল্পও প্রত্যাশা করে একটি বৈজ্ঞানিক, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা। এই পরিষদ গঠনের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নীতিগত প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৯৩ সালে সরকার ৭৩৯টি ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে সেই তালিকা সীমিত করে ১১৭টি ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা হয়্র। এ প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ ২০১৮ সালে একটি রিট আবেদন দায়ের করে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে উচ্চ আদালত গত বছরের ২৫ আগস্ট রায়ে পর্যবেক্ষণ করেন যে, অত্যাবশ্যকীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও কার্যকর তদারকি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব; এটি কোনো একক প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত রাখা সমীচীন নয়। আদালত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের একক কর্তৃত্বের পরিবর্তে একটি স্বাধীন ও বিশেষজ্ঞ ভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের নির্দেশনা প্রদান করেন। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সভাপতি করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। স্বাস্থ্যস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অর্ন্তভুক্ত করে গঠিত এই টাস্কফোর্স পরবর্তীকালে একটি উপকমিটির মাধ্যমে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের নীতিমালা প্রণয়ন করে, যা ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। বর্তমান জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের কার্যক্রমও মূলত সেই নীতিমালার বাস্তবায়নকে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে বলেই প্রতীয়মান হয়। এই নীতিমালার একটি ইতিবাচক দিক হলো, সরকার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের জন্য একটি বেঞ্চমার্ক নির্ধারণ করেছে। এর ফলে মূল্য নির্ধারণে একটি অভিন্ন কাঠামো প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এই কাঠামো কতটা জনবান্ধব এবং কতটা ব্যবসাবান্ধব?
বর্তমান ব্যবস্থায় ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের আবেদনের সহিত মূলত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কাঁচামালের ব্যয় বিবেচনা করা হয়। এরপর ওষুধের ধরন অনুযায়ী কাঁচামালের মূল্যের উপড় ১.৫ থেকে ৩.৫ গুণ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট গুণিতক প্রয়োগ করে উৎপাদন উপরিখরচ ও মুনাফার জন্য বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়। কাঁচামালের তথ্য ও উপাত্ত যাচাই করে বরাদ্দকৃত উপরিখরচ ও মুনাফা যোগ করে ঔষধের খুচরা মূল্যের অনুমোদন দেওয়া হয়। একই গেজেটে সরকার নির্দেশনা দিয়েছে যে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যৌক্তিক মুনাফা নির্ধারণের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয ওষুধের মূল্য সহনীয রাখা এবং জনগণের জন্য এর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়, উপরিখরচ ও যৌক্তিক মুনাফা স্বাধীনভাবে যাচাই না করে শুধুমাত্র বেঞ্চমার্ক ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ করলে, তা গেজেটে ঘোষিত এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। কেননা বাস্তব উৎপাদন ব্যবস্থায় উপরিখরচ কেবল কাঁচামালের মূল্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এটি নির্ভর করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত শ্রমঘণ্টা, মেশিনঘণ্টা, উৎপাদন সক্ষমতা, ব্যবহত কারখানার আয়তন, উৎপাদনের গতিবিধি, কারখানার অবচয়, বিনিয়োগ ব্যয়, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ ইউটিলিটি ব্যয়, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক ব্যয়সহ বহু উপাদানের ওপর। অর্থাৎ উপরিখরচের সঙ্গে কাঁচামালের একটি সরাসরি বা আনুপাতিক সম্পর্ক সবসময় থাকে না।
আইডিএলসির একটি বিজনেস রিভিউ প্রকাশনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ইউটিলিটি ব্যয় আন্তজার্তিক মানের কাছাকাছি হলেও শ্রম ব্যয় এবং গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম; অন্যদিকে কাঁচামালের ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে কাঁচামালের মূল্যের ওপর নির্দিষ্ট গুণিতক প্রয়োগ করে উপরিখরচ নির্ধারণ করিলে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। এতে জনস্বার্থ ও ব্যাবসায়িক স্বার্থ উভয়েই বিগ্নিত হতে পারে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান নীতিমালায় বেঞ্চমার্ক মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য অনুমোদনের সুযোগ না থাকায় ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ স্বাভাবিকভাবেই বেঞ্চমার্ক মূল্যেই আবেদন করবে। এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যয় কম হলে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, আবার কারও প্রকৃত ব্যয় বেশি হলে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই দুই পরিস্থিতির কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তা বা শিল্প কোনো পক্ষের জন্যই টেকসই নয়।
কাজেই সরকারের উচিত স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক সঠিক, যথাযথ প্রক্রিয়া ও মানদণ্ড অনুসরণ করে উপরিখরচ বণ্টন এবং যৌক্তিক মুনাফার মাধ্যমে একটি পূর্ণাজ্ঞ ব্যয় বিবরনী গ্রহন করার। আর এখানেই স্বাধীন পেশাদার কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টদের (সিএমএ) সম্পৃক্ততার যৌক্তিকতা তৈরি হয়। আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃত কস্ট অ্যাকাউন্টিং নীতি, যথাযথ ব্যয় বণ্টন পদ্ধতি এবং গ্রহনযোগ্য মানদণ্ড অনুসরণ করে সিএমএ রা একটি পূর্ণাঙ্গ কস্ট স্টেটমেন্ট প্রস্তুত করতে পারেন, যেখানে উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় এবং যৌক্তিক মুনাফা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।
তাই ওষুধের মূল্য নির্ধারণে একটি দ্বৈত পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, সরকার নির্ধারিত বেঞ্চমার্ক মূল্য; দ্বিতীয়ত, স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত পূর্ণাঙ্গ ব্যয় বিবরণীর ভিত্তিতে নির্ধারিত মূল্য। এই দুইয়ের মধ্যে যে মূল্য কম হবে, সেটিকেই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। কেননা সকল ঔষধ উৎপাদনকারী উপরি খরচ একই হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ যে সকল উৎপাদনকারী বেশী কমপ্লায়েন্স মান্য করবে তাদের খরচ বেশী হবে এবং যে সকল ঔষধ উৎপাদনকারী কম কমপ্লায়েন্স মান্য করবে তাদের খরচ কম হবে। কাজেই স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক প্রকৃত উপরি খরচ ও যৌক্তিক মুনাফা যাচাই করে বেঞ্চমার্কের সঙ্গে তুলনা করে মূল্য নির্ধারণ সিদ্ধান্ত জনস্বার্থ নিশ্চিত করে। অন্যদিকে যেখানে প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় বেঞ্চমাকের্র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেখানে অধিকতর গবেষণা করে নির্ধারিত গুণিতক সময়োপযোগীভাবে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের ব্যবস্থা একদিকে যেমন জনস্বার্থ ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে শিল্পের টেকসই বিকাশ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে এবং জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের মূল উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনকল্যাণ ও ব্যবসার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা বাস্তব রূপ লাভ করবে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আজ আন্তজার্তিক বাজারে সুনাম অর্জন করেছে। শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে এবং দেশীয় শিল্প বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। এই অর্জনকে টেকসই রাখতে হলে আন্তজার্তিক বাজারে মুক্তবাজার অর্থনীতি নীতির আলোকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করে যথাযথ মূল্য অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় স্থানীয় বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে একদিকে সাধারণ মানুষের ওষুধপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয় এবং অন্যদিকে দেশীয় ওষুধ শিল্পের টেকসই বিকাশ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় থাকে। জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ কেবল একটি প্রশাসনিক কমিটি নয়; এটি এমন একটি নীতিনির্ধারণী প্লাটফর্ম, যার সিদ্ধান্ত সরাসরি কোটি মানুষের স্বাস্থ্য, শিল্পের প্রতিযোগিতা, বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং প্রয়োজন এমন একটি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা, যা হবে বৈজ্ঞানিক, তথ্য নির্ভর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিকঅ স্বাধীন ব্যয় যাচাই, আন্তজার্তিক মানসম্পন্ন কস্ট অ্যাকাউন্টিং এবং পেশাদার কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করতে পারে, তবে তা শুধু উচ্চ আদালতের নির্দেশনার যথাযথ প্রতিফলনই হবে না; বরং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ন্যায়সংগত ও টেকসই ওষুধ মূল্য নির্ধারণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
লেখক: মোঃ মামুনুর রশিদ মন্ডল এসিএমএ, রসুল রশিদ হায়দার এন্ড কোং, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস।