বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় সেনা হত্যাযজ্ঞে শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীতে সামরিক কবরস্থানে তারা এই শ্রদ্ধা জানান।
পুস্পস্তবক অর্পণ শেষে শহিদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং কর্মরত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ স্যালুট প্রদান করেন। পরবর্তীতে শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।
এর আগে আজ সকাল ১০টার দিকে তাঁরা সেখানে পৌঁছান। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো একসঙ্গ কোনো আয়োজনে যোগ দিলেন।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক এবং শহিদ পরিবারের সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁরা কবরস্থান ত্যাগ করেন।
এর আগে এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাগরিক হিসেবে বিষয়টি সবার উপলব্ধিতে থাকা জরুরি। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের কাছে পিলখানার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ এখন বোধগম্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের পর নানা ধরনের মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র বাহিনী একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা, বীরত্ব ও গৌরবের প্রতীক।
ভবিষ্যতে যেন কেউ সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে না পারে, সে জন্য পুনরায় শপথে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী যে কোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াবে—এই হোক শহীদ সেনা দিবসের প্রত্যয়।
আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর। ২০০৯ সালে তৎকালীন বিডিআরের সদর দপ্তরে দুই দিন ধরে চলা বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডে জাতি হারায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তা। মোট নিহত হন ৭৪ জন। পিলখানার ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডে রচিত হয় নিমর্মতার এক কালো অধ্যায়।
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় পিলখানা সদর দপ্তরে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) দরবার হলে শুরু হয় বার্ষিক দরবার। বিডিআর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বক্তব্যের একপর্যায়ে বিডিআরের কিছু বিদ্রোহী সৈনিক অতর্কিত হামলা চালায় দরবার হলে। এরপর ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা। বিডিআরের বিদ্রোহী সৈনিকরা উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা সেনা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে তাদের পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করেন। পুরো পিলখানায় এক বীভৎস ঘটনার সৃষ্টি হয়। নানা নাটকীয়তায় পিলখানার ভিতরের নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞ শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিদ্রোহের অবসান ঘটলে পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ।
২৭ ফেব্রুয়ারি পিলখানার ভিতরে সন্ধান মেলে একাধিক গণকবরের। সেখানে পাওয়া যায় তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, তার স্ত্রীসহ সেনা কর্মকর্তাদের লাশ। এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা মহানগর তৃতীয় বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিডিআরের সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৭৭ জনকে খালাস দেয়া হয়।
সর্বশেষ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গেল বছরের ১৯ জানুয়ারি ২৫০ জন বিডিআর জওয়ানকে জামিন দেন আদালত। ২৩ জানুয়ারি ১৭৮ জনকে মুক্তি দেয়া হয়।