ইমা এলিস, নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি: যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে এক অভিবাসীর বিরুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ ডলারের দেওয়ানি মামলা দায়ের করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এই মামলা প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলের প্রতিফলন যার লক্ষ্য হলো অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ওপর বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা চাপিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা। এটি প্রেসিডেন্টের সরকারজুড়ে চালানো অভিবাসনবিরোধী অভিযানের একটি অংশ মাত্র।
ফেডারেল মামলায় মার্তা আলিসিয়া রামিরেজ ভেলিজ–এর কাছ থেকে ৯৪১,১১৪ ডলার দেওয়ানি জরিমানা (সুদসহ) আদায়ের আবেদন করা হয়েছে। বিচার বিভাগের তথ্যমতে, তিনি ভার্জিনিয়ার চেস্টারফিল্ড কাউন্টিতে বৈধ অনুমতি ছাড়াই বসবাস করছেন।
রামিরেজ ভেলিজ কবে বা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে ২০১৯ সালে একজন অভিবাসন বিচারক তাকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেন। ২০২২ সালে বোর্ড অব ইমিগ্রেশন অ্যাপিলস তার আপিল খারিজ করলে সেই নির্দেশ চূড়ান্ত হয় বলে জানিয়েছে বিচার বিভাগ।
সরকারি আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তাকে জরিমানার নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে তিনি কোনো আপিল করেননি।
কর্তৃপক্ষ জানায়, বোর্ড অব ইমিগ্রেশন অ্যাপিলসের সিদ্ধান্ত থেকে এপ্রিল মাসে নোটিশ পাওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন ৯৯৮ ডলার করে হিসাব করে প্রায় ১০ লাখ ডলারের অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, আসামি এখনো কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি এবং আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ জরিমানার অর্থ ও অতিরিক্ত ধার্য অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার দায় হিসেবে রয়ে গেছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই প্রায় সাত অঙ্কের জরিমানার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, এটি এ ধরনের মামলায় রেকর্ড অঙ্কের একটি জরিমানা।
জনস্বার্থভিত্তিক আইন সংস্থা পাবলিক জাস্টিসের আইনজীবী চার্লস মুর পলিটিকোকে বলেন, “আমরা যখন এসব মামলা পর্যবেক্ষণ করছিলাম, তখন জরিমানার অঙ্ক ৩ হাজার ডলার থেকে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত দেখেছি। কিন্তু প্রায় ১০ লাখ ডলারের মতো কিছু আমরা আগে শুনিনি।”
বিচার বিভাগের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে গণমাধ্যম–এর মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি। রামিরেজ ভেলিজের আইনজীবীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এর আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি গ্রীষ্ম পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ২১,৫০০ জন অভিবাসীর বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করেছে, যার মোট অঙ্ক ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অভিযোগ করা হয়েছে, এসব অভিবাসী দেশত্যাগের নির্দেশ অমান্য করেছেন। জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মামলা, দেনা আদায়কারী সংস্থা এবং বড় অঙ্কের কর বিলের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৬ সালের একটি অভিবাসন আইনের আওতায় চলতি বছরের জুনে এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করে রিপাবলিকান প্রশাসন। তবে গত তিন দশকের বেশিরভাগ সময়ে এ ধরনের জরিমানা খুব কমই প্রয়োগ করা হয়েছে; সাধারণত কর্তৃপক্ষ দেশত্যাগ কার্যকর করাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আগে গণমাধ্যমকে বলেন, সচিব ক্রিস্টি নোয়েমের বার্তা 'একেবারে স্পষ্ট আপনি যদি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, এখনই দেশ ছাড়ুন, নতুবা পরিণতি ভোগ করুন।'
ডিএইচএস জানিয়েছে, যারা স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করবেন, তাদের ওপর আরোপিত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে না। প্রশাসন ‘সিবিপি হোম’ অ্যাপের মাধ্যমে স্বেচ্ছা দেশত্যাগে উৎসাহ দিচ্ছে যার আওতায় বিনা খরচে যাতায়াত, দেশত্যাগে ব্যর্থতার জরিমানা মওকুফ এবং ২,৬০০ ডলারের প্রস্থান বোনাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এই অ্যাপটির আগের নাম ছিল সিবিপি ওয়ান, যা বাইডেন প্রশাসনের সময় চালু হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে ১০ লাখের বেশি অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগেই অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে পেরেছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন সেই অ্যাপের মাধ্যমে প্রবেশ করা সব অভিবাসীর আইনি মর্যাদা বাতিল করেছে।
আমেরিকান ইমিগ্রেশন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির এই দাবির সমালোচনা করে বলেছে, স্বেচ্ছা দেশত্যাগ করলে ভবিষ্যতে 'আইনগতভাবে ফিরে আসার সুযোগ' দেওয়ার কথা বলা একটি 'গভীরভাবে বিভ্রান্তিকর ও অনৈতিক কৌশল।'
অভিবাসন আইনজীবীদের মতে, যাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগের রেকর্ড থাকে, তাদের ভবিষ্যতে ভিসা আবেদনে দীর্ঘ অপেক্ষা বা সরাসরি প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়ার আশঙ্কা বেশি।
জরিমানার শিকার হওয়া অনেক অভিবাসী বলছেন, এসব ব্যবস্থা তাদের আগে থেকেই থাকা মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত বছরের শুরুতে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছর ধরে বসবাসরত হন্ডুরাসের এক নারীকে ২০০৫ সালের দেশত্যাগ আদেশ অমান্যের অভিযোগে প্রায় ২০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়।
তিন মার্কিন নাগরিক সন্তানের ৪১ বছর বয়সী সেই মা সিবিএস নিউজকে বলেন,'আমি সারাক্ষণ উদ্বেগে থাকি… ঘুমাতে পারি না… কিছুই অনুভব করি না।'
জরিপগুলো দেখাচ্ছে, ট্রাম্পের গণ-বহিষ্কার উদ্যোগ নিয়ে জনমত বিভক্ত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের 'সবচেয়ে বড় বহিষ্কার অভিযান' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
একটি সাম্প্রতিক নিউ ইয়র্ক টাইমস জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভোটার যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ট্রাম্পের ভূমিকাকে সমর্থন করেন। তবে ৬১ শতাংশ মনে করেন, আইসিইর কৌশল অতিরিক্ত কঠোর। রয়টার্সের জরিপে দেখা গেছে, অভিবাসন নীতিতে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩৯ শতাংশে।