সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
আন্তর্জাতিক

চিকিৎসাক্ষেত্রে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

চলতি বছরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন বিজ্ঞানী। তারা হলেন- যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডেইসেরথ এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল।

মস্তিষ্ক কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে—দীর্ঘদিনের এই রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এই তিন বিজ্ঞানীকে। 

সোমবার (৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়।

‘অপ্টোজেনেটিকস’ নামের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন ও বিকাশে অবদানের জন্য তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবিত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো ব্যবহার করে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।

নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদ্ধতি স্নায়ুকোষ কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ তৈরি করে, তা জীবিত মস্তিষ্কে সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে স্নায়ুবিজ্ঞানে গবেষণার নতুন যুগের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

মস্তিষ্ক কীভাবে অনুভূতি, আচরণ ও শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, তা দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্য ছিল। ২০ শতকে গবেষকরা মস্তিষ্কের কোন অংশ কোন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তা শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। তবে সে সময়কার প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো নির্দিষ্ট অংশ ও কার্যক্রমের মধ্যে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

অপ্টোজেনেটিকস সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর করেছে। নোবেল কমিটির মেডিসিন পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান পার সভেনিংসন বলেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা একসময় শুধু কল্পনা করা যেত।

অপ্টোজেনেটিকসের ভিত্তি তৈরি হয় পিটার হেগেমানের গবেষণা থেকে। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এককোষী শৈবাল ক্ল্যামাইডোমোনাস কীভাবে আলোর উৎসের দিকে সাঁতার কাটে।

২০০০-এর দশকের শুরুতে হেগেমান ও জর্জ নাগেল শৈবালের কোষের পৃষ্ঠে থাকা একটি বিশেষ প্রোটিন আবিষ্কার করেন। এর নাম দেওয়া হয় ‘চ্যানেলরোডপসিন’।

নীল আলো এই প্রোটিনের ওপর পড়লে এর ভেতরে একটি চ্যানেল খুলে যায়। এর মাধ্যমে চার্জযুক্ত আয়ন কোষের ভেতরে প্রবেশ করে এবং বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে। গবেষকরা দেখতে পান, এই প্রোটিন অন্য কোনো কোষে প্রবেশ করালেও সেই কোষ আলো-সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

কার্ল ডেইসেরথ এরপর চ্যানেলরোডপসিন তৈরির জিন ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করান। নীল আলো প্রয়োগ করে তিনি ওই স্নায়ুকোষে স্নায়ু সংকেত তৈরি করতে সক্ষম হন।

২০০৫ সালে তিনি এ গবেষণার ফল প্রকাশ করেন। এর দুই বছর পর জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে আলো ব্যবহার করে স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণেও সফল হন তিনি।

আলো ব্যবহার করে স্নায়ু সংকেত নিয়ন্ত্রণের এই পদ্ধতিই পরবর্তীতে ‘অপ্টোজেনেটিকস’ নামে পরিচিত হয়।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ু সার্কিট শনাক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও অপ্টোজেনেটিকস নিয়ে গবেষণা চলছে। দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়েও গবেষকরা এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

নোবেল কমিটির মতে, অপ্টোজেনেটিকস মস্তিষ্ক সম্পর্কে মানুষের বোঝাপড়ায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে—মানবজাতির দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় রহস্য—এই প্রযুক্তি তা উন্মোচনের নতুন পথ তৈরি করেছে।

২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক মেরি ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড রামসডেল এবং জাপানের শিমন সাকাগুচি। ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ সংক্রান্ত যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

১৯০১ সালে আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্র অনুযায়ী নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। ডিনামাইট আবিষ্কারক নোবেল তার যাবতীয় সম্পদ উৎসর্গ করেন মানবতার কল্যাণে, বিশেষ করে চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি দিতে। পরে অর্থনীতিকে যুক্ত করা হয়, যার অর্থায়ন করে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিবছর পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি। চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও অর্থনীতিতে নোবেল প্রদান করা হয় সুইডেনের স্টকহোমে, আর একমাত্র শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয় নরওয়ের রাজধানী অসলোতে।

প্রসঙ্গত, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয়ীদের নাম ঘোষণার মাধ্যমেই প্রতিবছরের নোবেল পুরস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নোবেল পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

▐ সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ