সিরাজগঞ্জের তাড়াশ পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পৌর প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন ও স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোহাগ রানার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে একাধিক রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের তথ্য থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলা নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তাড়াশ পৌরসভার জন্য ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রজ্ঞাপনে পৌর মেয়রের পদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই সময় পৌর প্রকৌশলী স্বল্প পরিচিত একটি পত্রিকায় দরপত্র আহ্বান করেন। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং পাঁচটি প্যাকেজের সব কাজ এককভাবে এস এস এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, দরপত্রে প্যাকেজভিত্তিক প্রাক্কলিত ব্যয় উল্লেখ না থাকায় ইজিপি প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। পরে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে পৃথকভাবে প্যাকেজের আর্থিক পরিমাণ জানিয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
এদিকে আমরাও আছি পাশে নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন তাড়াশ পৌরসভার সেবা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমত জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে নাগরিক সেবা ঘাটতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। পৌরবাসীর দাবি, নিয়মিত কর পরিশোধ করেও তারা ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা পাচ্ছেন না।
পৌর শহরের ব্যবসায়ী আনন্দ কুমার ঘোষ, রতন কুমার ও স্বপন কুমার জানান, পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময়েও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বর্ষায় রাস্তায় পানি জমে দোকানে প্রবেশ করে। শিউলি মেশিনারিজের মালিক মো. শাজাহান আলী মাষ্টার বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে বাজার ও আবাসিক এলাকায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
দক্ষিণ পাড়ার বাসিন্দা মাহাতাব হোসেন বলেন, বিকল্প সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় রয়েছে। এতে চলাচলে দুর্ভোগ বাড়ছে।
সরেজমিনে পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ এলাকায় ড্রেন নির্মাণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কয়েকটি স্থানে সড়ক নির্মাণের চিহ্ন থাকলেও সেগুলোর মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন রয়েছে। কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ও বাজার এলাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে।
উপজেলা নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু জানান, ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত গ শ্রেণির তাড়াশ পৌরসভা এখনো মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। খেলার মাঠ, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি ও অটোভ্যান গ্যারেজ না থাকায় নাগরিক ভোগান্তি বাড়ছে।
অভিযোগের বিষয়ে এস এস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোহাগ রানা বলেন, নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে একাধিক স্থানে এ ধরনের সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।
পৌর প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন বলেন, নিয়ম মেনেই দরপত্র আহ্বান ও কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থে কোন কোন স্থানে কতটুকু কাজ হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করে জানানো সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নুসরাত জাহান জানান, পাঁচটি প্যাকেজের আওতায় নির্ধারিত কাজের পরিমাণ ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, অভিযোগের বিষয়টি পর্যালোচনা করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পৌরবাসীর প্রত্যাশা, বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।