মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শিরোনাম
নির্বাচিত কলাম

আর্থিক নীতির প্রভাব:

কর্মসংস্থান হ্রাস ও সামাজিক বৈষম্যের গভীরতা

বাংলাদেশে সরকারি আর্থিক নীতি কেবল বাজেটের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি দেশের শিল্পখাত, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকে সরকার রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার অনিবার্য পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু এই সমন্বয়গুলো যখন কাঠামোগত অদক্ষতা, দুর্নীতি ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার সংস্কার ছাড়াই বাস্তবায়িত হয়, তখন তার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে শিল্প, শ্রমিক এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর। এর ফলাফল আজ স্পষ্ট— উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সংকোচন এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য।

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও শিল্পখাতের চাপ: দুই বছর আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প— যা দেশের প্রধান রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের উৎস। এই শিল্প এখনও এই ধাক্কা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পোশাক শিল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বারবার বৃদ্ধি পেয়েছে, একই সঙ্গে ন্যূনতম মজুরি ও শ্রম ব্যয় বেড়েছে। অথচ একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের গড় রপ্তানী মূল্য মোটামুটি মাত্র ১০ শতাংশ বেড়েছে। এর অর্থ, বৈশ্বিক ক্রেতাদের তীব্র চাপ ও প্রতিযোগিতার কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সুবিধা রপ্তানিমূল্যে প্রতিফলিত করা সম্ভব হয়নি। এই চাপ মোকাবিলায় কারখানাগুলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পরিচালন দক্ষতা উন্নত করা এবং খরচ কমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সব প্রতিষ্ঠান এই চাপ সহ্য করতে পারেনি। ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও সংকুচিত মার্জিনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে বহু কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ ফল কর্মসংস্থান হ্রাস। এই অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে: ব্যয়-সম্প্রসারণমূলক নীতি তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের টিকে থাকার জন্য গুরুতর হুমকি।

বেতন ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ বনাম কর্মসংস্থান বাস্তবতা: যে সময়ে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে এবং সামাজিক বৈষম্য গভীরতর হচ্ছে, সেই সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক নীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, শিল্প প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। অথচ ক্রমাগত ইউটিলিটি মূল্যবৃদ্ধি, আয়করের চাপ এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকেই নিরুৎসাহিত করছে। পোশাক খাতে শ্রমিকদের মজুরি প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায় এবং সময়ে সময়ে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কর্মকর্তা ও মধ্য-স্তরের পেশাজীবীদের জন্য কোনও সুসংগঠিত বেতন কাঠামো নেই। অন্যান্য শিল্পেও একই চিত্র—অনেক ক্ষেত্রেই কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বেতন কাঠামো বিদ্যমান নেই। এই বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পখাতের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।

নবম জাতীয় বেতন কমিশন: মরার উপর খাঁড়ার ঘা: এই প্রেক্ষাপটে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সরকারি খাতে বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ অনেকের কাছেই মরার উপর খাঁড়ার ঘা বলে মনে হচ্ছে। প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব প্রভাব—যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ —রাষ্ট্রের আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। সরকার যদি এই ব্যয় মেটাতে কর আদায় বাড়ায় বা সরকারি পরিষেবার মূল্য বৃদ্ধি করে, তবে তার প্রকৃত বোঝা বহন করতে হবে বেসরকারি খাতের কর্মচারী, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বেকার জনগোষ্ঠীকে। যারা সরকারি বেতন বৃদ্ধির সরাসরি সুবিধা পান না, কিন্তু পরোক্ষভাবে এর মূল্য পরিশোধ করেন—তাদের স্বার্থ কি যথেষ্টভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি: নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশগুলি বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি একটি সিরিজের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তা হলো;

১. উন্নয়ন এবং শিক্ষা ব্যয়সংকোচন: উচ্চ বিলাসী বেতন ব্যয়ের অর্থায়নের জন্য, সরকার দেশী-বিদেশী ঋণের উপর নির্ভর করতে পারে অথবা উন্নয়ন ও শিক্ষার জন্য বরাদ্দ কমাতে পারে। মানব পুঁজি এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হ্রাস দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, অন্যদিকে উচ্চ ঋণ সুদের বাধ্যবাধকতা এবং আর্থিক দুর্বলতা বৃদ্ধি করবে।

২. অতিরিক্ত কর চাপ: রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য, ব্যবসা এবং ভোক্তাদের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হতে পারে। উচ্চ কর্পোরেট এবং পরোক্ষ কর উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করবে এবং অর্থনৈতিক গতি দুর্বল করবে।

৩. ক্রমবর্ধমান পরিবহন ব্যয়: বাংলাদেশে জ্বালানির দামের সাথে পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয় জড়িত। সরকারি খাতে বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির ফলে এই খরচ বৃদ্ধি পাবে, ফলে জ্বালানির দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে।

৪. বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি: অব্যবস্থাপনাকে বিচ্ছিন্ন ও দূর করার পরিবর্তে, ইউটিলিটি খাতের অদক্ষতা নিয়মিতভাবে দামসমন্বয়ের মধ্যে নিমজ্জিত হয়। বর্ধিত বেতন ব্যয় পরিচালন ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলবে, যার ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির নতুন প্রস্তাব আসবে।

৫. উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং প্রতিযোগিতামূলকতার ক্ষতি: বর্ধিত জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করবে, রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলকতা দুর্বল করবে এবং ক্রেতাদের বিকল্প উৎসের গন্তব্য খুঁজতে উৎসাহিত করবে।

৬. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি: বর্ধিত অর্থ সরবরাহ এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাবে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাবিত করবে।

৭. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস: উচ্চ ব্যয়, ভারী করের বোঝা এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ হ্রাস দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে, যার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে।

৮. সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি: যদিও সরকারি খাতের কর্মচারীরা উচ্চ আয়ের সুবিধা ভোগ করবে, মুদ্রাস্ফীতির কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রকৃত আয় হ্রাস পাবে, যার ফলে আয় ও সম্পদের বৈষম্য তীব্রতর হবে।

৯. আইনশৃঙ্খলার অবনতি: অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব এবং বৈষম্য প্রায়শই সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণ হয়। বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান হ্রাসের ফলে চুরি, ডাকাতি এবং বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জের ঘটনা বৃদ্ধি পেতে পারে।

১০. দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার মূল সমস্যা: অতীতেও সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমানোর যুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্নীতির মূল কারণ বেতন নয়; বরং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জবাবদিহিতার অভাব এবং শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। অতিরিক্ত বেতন দিয়ে অতিরিক্ত বিলাসিতার লোভ দমন করা যায় না। একটি ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে হলে নীতিগত অগ্রাধিকারে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। বেতন বৃদ্ধি দিয়ে পুনরাবৃত্তি ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত:
ক) শাসনব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা জোরদার করা।
খ) দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা কমানো।
গ) সরকারি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
ঘ) জ্বালানি ও ইউটিলিটি খাতে কাঠামোগত সংস্কার আনা।
ঙ) সরকারি বেতন সংস্কারকে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতা ও সেবার মানের সঙ্গে যুক্ত করা।
চ) বেসরকারি খাতকে সুরক্ষা ও উৎসাহ প্রদান করা।

প্রয়োজনে সরকারি খাতের ক্ষতিপূরণ সংস্কার পরিমাপযোগ্য উৎপাদনশীলতা লাভ, পরিষেবার মান উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সাথে যুক্ত করা উচিত। একই সাথে, নীতিমালা অবশ্যই বেসরকারি খাতকে রক্ষা এবং শক্তিশালী করতে হবে, যা কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের প্রাথমিক উৎস। বেসরকারি খাতই কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। তাই সরকারি খাতের সংস্কার ও বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য। এই ভারসাম্য ছাড়া ক্রমবর্ধমান ব্যয়, প্রতিযোগিতার সুযোগ হ্রাস ও সামাজিক বৈষম্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে থাকবে।

(লেখক : মোঃ মামুনুর রশিদ মন্ডল, এসিএমএ কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব)

এই সম্পর্কিত আরো