শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি : প্রধানমন্ত্রী কনটেন্ট ক্রিয়েশনের নেশা - যখন ভাইরাল হওয়ার স্বপ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করছে উপকরণের দাম বাড়ায় লাভ নিয়ে শঙ্কায় নরসিংদীর প্রতিমা শিল্পীরা ছাত্রলীগ নেতাকে দেখতে গিয়ে গ্রেপ্তার বাবা, কারাগারে দু’জনই নান্দাইলে পুকুরে ডুবে দুই ভাইবোনের মৃত্যু এতিম ৫ কন্যার পাশে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহে অটোরিকশা-বাস মুখোমুখি সংঘর্ষ - নিহত ৭ যাত্রীর মধ্যে একই পরিবারের ৪ জন বনানী কাঁচা বাজারে বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক প্রচারণামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক বৈষম্য হবে না - ৪৯তম বিসিএসের 'বাদ পড়া' ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপন সোমবার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিটের নতুন নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট’
advertisement
নির্বাচিত কলাম

কনটেন্ট ক্রিয়েশনের নেশা

যখন ভাইরাল হওয়ার স্বপ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করছে

একটা সময় ছিল, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সঙ্গে বই, শিক্ষা, জ্ঞান, গবেষণা, খেলাধুলা কিংবা কোনো একটি পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে থাকত। এখন সেই স্বপ্নের জায়গায় ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে অন্য এক সংস্কৃতি—ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি।

হাতে স্মার্টফোন, সামনে ক্যামেরা আর মাথায় একটাই চিন্তা—কীভাবে রাতারাতি পরিচিত হওয়া যায়, কীভাবে বেশি ভিউ পাওয়া যায়, কীভাবে লাখো মানুষের নজরে আসা যায়।

কনটেন্ট ক্রিয়েশন নিজে কোনো সমস্যা নয়। ডিজিটাল যুগে এটি সৃজনশীলতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, তথ্যপ্রচার ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু যখন কনটেন্ট তৈরি একটি সৃজনশীল কাজের পরিবর্তে নেশায় পরিণত হয়, তখন সেটি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকেই প্রভাবিত করে না; ধীরে ধীরে তার প্রভাব পড়ে পুরো প্রজন্মের ওপর। আর এই নেশাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে আমাদের মিডিয়া সংস্কৃতির একটি অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তি অস্বাভাবিক, বিতর্কিত কিংবা উদ্ভট কোনো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভাইরাল হলেই তাকে নিয়ে শুরু হচ্ছে আলোচনা। তাকে বিভিন্ন টক শোতে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে, নেওয়া হচ্ছে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। কখনো কখনো সেই সাক্ষাৎকারের মূল বিষয় হয়ে উঠছে তার ভাইরাল হওয়ার গল্প, ব্যক্তিগত জীবনের অপ্রয়োজনীয় তথ্য কিংবা এমন সব বিষয়, যা দর্শকের কৌতূহল তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু সমাজের জন্য কোনো অর্থপূর্ণ জ্ঞান বা মূল্য তৈরি করে না।

ফলে একটি বিপজ্জনক বার্তা যাচ্ছে তরুণদের কাছে—

“তুমি যদি পরিচিত হতে চাও, তাহলে জ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই; ভাইরাল হলেই হবে।”

আরও ভয়ংকর হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণমাধ্যমই সেই ভাইরাল ব্যক্তিকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। যে ব্যক্তি গতকাল পর্যন্ত কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি আলোচিত মুখ ছিলেন, আজ তাকে টেলিভিশনের আলোচিত অতিথি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তার বক্তব্য, ব্যক্তিগত জীবন, কর্মকাণ্ড—সবকিছু নিয়ে অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে।

এখানে প্রশ্ন ওঠে সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য নিয়ে।

সাংবাদিকতা কি মানুষের কৌতূহলকে কেবল পণ্যে পরিণত করবে, নাকি সমাজকে তথ্য, বিশ্লেষণ ও জ্ঞান দেওয়ার দায়িত্বও পালন করবে?

একজন ব্যক্তি ভাইরাল হয়েছেন—এটি নিজেই সংবাদ হতে পারে। কিন্তু তাকে ঘিরে কী ধরনের আলোচনা তৈরি করা হচ্ছে, কী প্রশ্ন করা হচ্ছে, কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—সেখানেই সাংবাদিকতার মানদণ্ডের পরীক্ষা।

সস্তা চমক, ব্যক্তিগত কৌতূহল এবং দর্শক টানার প্রতিযোগিতা যদি সাংবাদিকতার জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একটি অনুষ্ঠানের হয় না। ধীরে ধীরে টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং পুরো প্রযোজনা খাতের মানদণ্ডই নিচে নামতে থাকে।

কারণ দর্শক যা দেখতে চায়, বাজার তা-ই সরবরাহ করে। আর বাজার যা বারবার সরবরাহ করে, মানুষ ধীরে ধীরে সেটাকেই স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করতে শুরু করে।এই চক্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শিক্ষার্থীদের নিয়ে।

একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে, দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে একজন শিক্ষার্থীকে পরিচিত হতে হচ্ছে; অন্যদিকে একজন ভাইরাল কনটেন্ট নির্মাতা কয়েকটি ভিডিও দিয়েই বিপুল পরিচিতি পাচ্ছেন, তখন তার কাছে কোন পথটি বেশি আকর্ষণীয় মনে হবে?

যখন বই পড়তে সময় লাগে, দক্ষতা অর্জনে বছর লাগে, কিন্তু একটি ভিডিও কয়েক ঘণ্টায় লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে—তখন ধৈর্যের সংস্কৃতি স্বাভাবিকভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

ফলে পড়াশোনা বিরক্তিকর মনে হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে কঠিন মনে হতে পারে, আর তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাকে জীবনের সাফল্যের মাপকাঠি বলে মনে হতে পারে।এখানেই শুরু হয় আসক্তির আরেকটি স্তর।

একটি ভিডিও আপলোড করা, ভিউ দেখা, লাইক গোনা, অনুসারীর সংখ্যা বাড়ার অপেক্ষা করা, আবার নতুন ভিডিও বানানো—এই চক্র থেকে বের হতে না পারলে কনটেন্ট ক্রিয়েশন এক ধরনের আচরণগত আসক্তির রূপ নিতে পারে। এটি মাদকাসক্তির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়; তবে উভয়ের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত নির্ভরতা, নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে বিচ্যুতির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আর যদি একজন শিক্ষার্থী এই পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—সময়—ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে।

কেউ বই থেকে দূরে সরে যায়। কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কেউ দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে সারাদিন ক্যামেরার সামনে কী করা যায়, সেটি নিয়ে ভাবতে থাকে। কেউ আবার এমন কনটেন্ট তৈরির চেষ্টা করে, যা যত বেশি অস্বাভাবিক, তত বেশি ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

একসময় ব্যক্তিত্বের মূল্য নির্ধারিত হতে শুরু করে অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে।

জ্ঞান নয়—ভিউ।  যোগ্যতা নয়—ফলোয়ার। চরিত্র নয়—জনপ্রিয়তা।

সাফল্য নয়—ভাইরাল হওয়া। এই মানসিকতা কোনো সুস্থ সমাজের জন্য স্বাভাবিক হতে পারে না।

আমাদের আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—সব কনটেন্ট নির্মাতা ক্ষতিকর নন। অনেকেই অসাধারণ কাজ করছেন। শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংবাদ, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি কিংবা জনসচেতনতা নিয়ে অসংখ্য মানুষ মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করছেন। তাদের কাজ তরুণদের জন্য ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করছে।

সমস্যা কনটেন্ট ক্রিয়েশনে নয়।সমস্যা হলো ভিউ পাওয়ার জন্য যেকোনো কিছু করার মানসিকতায়।

সমস্যা হলো এমন একটি মিডিয়া সংস্কৃতিতে, যেখানে জ্ঞানের চেয়ে চমক বেশি বিক্রি হয়।

সমস্যা হলো এমন একটি সামাজিক পরিবেশে, যেখানে একজন তরুণকে বলা হয় না—“কিছু শেখো”; বরং বলা হয়—“ভাইরাল হও।” বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয়।

আমরা প্রযুক্তিকে বন্ধ করতে পারব না, করা উচিতও নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন ডিজিটাল শিক্ষার পাশাপাশি মূল্যবোধের শিক্ষা, মিডিয়া সচেতনতা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা। গণমাধ্যমকেও নিজেদের আয়না দেখতে হবে।

প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি মানুষের জ্ঞান বাড়াচ্ছি, নাকি শুধু মানুষের কৌতূহল বিক্রি করছি?

আমরা কি তরুণদের অনুপ্রাণিত করছি বই পড়তে, দক্ষতা অর্জন করতে, গবেষণা করতে, নতুন কিছু তৈরি করতে—নাকি তাদের শেখাচ্ছি যে কয়েক মিনিটের খ্যাতিই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন?

কারণ আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনাকারী।

তাদের হাতে যদি বইয়ের বদলে সারাক্ষণ শুধু ক্যামেরা থাকে, আর মাথায় যদি জ্ঞানের বদলে শুধু ভাইরাল হওয়ার চিন্তা থাকে, তাহলে ক্ষতিটা কোনো একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ।

তাই এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা কিছু জানে, নাকি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শুধু কিছু দেখাতে জানে?

ক্যামেরা থাকুক। কনটেন্ট থাকুক। প্রযুক্তি থাকুক। কিন্তু বইটাও থাকুক।শিক্ষাটাও থাকুক।চিন্তাশক্তিটাও থাকুক।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা যেন হারিয়ে না যায়।

কারণ ভাইরাল হওয়া কয়েক দিনের ব্যাপার; কিন্তু একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট হলে তার ক্ষত সারাতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।

লেখক: আল আমিন, প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ।

▐ সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ