বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
জাতীয়

শান্তিরক্ষায় মিশনগুলোকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোকে আরও আধুনিক, দূরদর্শী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের জন্য সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

বুধবার (১০ জুন) সকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গকারী বীর শান্তিরক্ষীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাবাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৭৫ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন এবং অনেকেই আহত হয়েছেন। তাদের এই আত্মদান কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।"

তিনি আরও যোগ করেন, এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জাতিসংঘের পতাকাতলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে শান্তিরক্ষায় আমাদের বাহিনী বদ্ধপরিকর। 

কিন্তু এ পথ বন্ধুর ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বমঞ্চে যে গৌরব ও কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তা সহজ ছিলো না। শত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এই মহান ও মানবিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাদের।

শান্তিরক্ষীদের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেন, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে একটি প্রতিকূল পরিবেশে  আপনারা নিষ্ঠা, সাহস ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আপনাদের এই অবদানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ২ লাখেরও বেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪৩ টি দেশের প্রায় ৬৩ টি শান্তিরক্ষা মিশনে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৮৬০ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১০ টি শান্তিরক্ষা মিশনে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। হাইতিতে নতুন একটি মিশনে যোগ দেয়ারও প্রস্তুতি চলছে।

তিনি বলেন, পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের  সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্য সাহসের সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু বিশ্ব শান্তি রক্ষায় আমাদের এই গৌরবের ইতিহাস একদিনে রচিত হয়নি। প্রায় চার দশক ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী একটি আস্থা ও নির্ভরতার নাম।

সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা, সম্মান ও সাহসের প্রতীক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। সেনাবাহিনীর একজন মেজরই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা আমাদের বাহিনীর জন্য অনন্ত প্রেরণার উৎস।"

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে কিছু অপতৎপরতা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও ইমেজ বিনষ্টের চেষ্টা করেছে। তবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সশস্ত্রবাহিনীর ওপর আসা সর্বগ্রাসী আঘাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বাহিনীগুলোর উদ্দেশে বলেন, ‘প্রফেশনালিজম, ইউনিটি, ডিসিপ্লিন এবং চেইন অফ কমান্ড’ ছাড়া সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন।

প্রধানমন্ত্রী বর্তমান জটিল বিশ্ব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি এখন সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অপব্যবহার, মিডিয়া অপপ্রচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো বিশ্বশান্তির নতুন অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি স্পষ্ট করেন, "অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সামনে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সবসময় বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনেও যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাবেন, তারা দেশের সুনাম সমুন্নত রাখবেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে একটি বিশেষ ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অবদান তুলে ধরা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী শহীদ শান্তিরক্ষীদের পরিবার ও আহত সদস্যদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানসহ সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকগণ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। কিন্তু এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি থাকায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ ১০ জুন এটি পালিত হচ্ছে।

 

সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ