গুমকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে একে ‘মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গুম আসলে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা শোক প্রকাশ করতে পারেন এবং দাফন-কাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু কেউ গুমের শিকার হলে পরিবার জানতেই পারে না সে কোথায় আছে।’
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি: একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সিম্পোজিয়ামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিচারপতি মঈনুল আরও বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এক স্থগিত অবস্থায় তারা সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট ও একঘরে হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
বিলিয়া আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, সাজ্জাদ হোসেন ও নূর খান লিটন; অধিকার-এর পরিচালক তাসকিন ফাহমিনা; বিলিয়ার সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ একরামুল হক এবং বিলিয়ার পরিচালক রাষ্ট্রদূত এম. মারুফ জামান।
বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আগের সরকারের আমলে গুম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। শেষ পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটে। জুলাই যোদ্ধারা দেশকে কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত করতে লড়াই করেছিলেন।
গত সরকারের আমলের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিচারপতি মঈনুল বলেন, সে সময় চরম নৃশংসতা বিদ্যমান ছিল এবং যেখানে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কেন্দ্রে ছিল গুম।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়ই ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করত, যাতে এসব কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ‘মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন ও দানবায়িত’ করা হয়েছিল, যাতে এসব কাজ সহজে সম্পন্ন হয়।
তিনি গুমের ঘটনাগুলোর তদন্তকে ‘কষ্টসাধ্য ও অত্যন্ত ক্লান্তিকর’ প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন, যা ভয়াবহ মাত্রার নিষ্ঠুরতার চিত্র উন্মোচন করে। তার মতে, নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ায় এ ধরনের লঙ্ঘন অব্যাহত ছিল।
বিচারপতি মঈনুল ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এ আইন ছিল ‘দন্তহীন ও নখহীন’। ফলে লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সে সময় বিচার বিভাগ ‘বিচারিক অধীনতা’র শিকার ছিল। অনেক বিচারক স্বাধীনতার অভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চ্যালেঞ্জ করতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘বিচারিক স্বেচ্ছাচারিতার চেয়ে ভয়াবহ কোনো স্বৈরাচার নেই।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি মানসিক অবস্থা, যা আদালতে যে পক্ষই থাকুক না কেন, বিদ্যমান থাকতে হবে।
বিচারপতি মঈনুল আশা প্রকাশ করে বলেন, প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে গৃহীত সংস্কারে মানবাধিকার সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, সাহসী ও নির্ভীক বিচার বিভাগই ন্যায়বিচার নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে গুম প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার মৌলিক অধিকার রক্ষায় আদালতের ওপর আস্থা রাখতে পারে। সূত্র-বাসস।