ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে বলে দাবি করছে তেহরান। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ‘নীতিগতভাবে’ তাদের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনা মেনে নিয়েছে, যা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তবে এখনই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে— এমন কোনও ইঙ্গিত দেয়নি ইরান; বরং চূড়ান্ত সমঝোতা নির্ভর করছে শর্ত পূরণ ও বিস্তারিত চূড়ান্ত হওয়ার ওপর।
বুধবার (৮ এপ্রিল) ভোরে বার্তাসংস্থা আনাদোলু বলছে, যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে তেহরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র ‘নীতিগতভাবে’ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে ইরান।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে বলেছে, এই প্রস্তাব ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা হবে।
আইআরআইবি জানিয়েছে, প্রস্তাবে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ইরানের অধিকার স্বীকৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার গভর্নর বোর্ডের ইরানবিরোধী সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করা, ক্ষতিপূরণ প্রদান, অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধরত বাহিনী প্রত্যাহার এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কাউন্সিল বলেছে, এই আলোচনা শুরু মানেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে— এমন নয়। চূড়ান্ত চুক্তি নির্ভর করবে ইরানের শর্ত পূরণ এবং বিস্তারিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার ওপর। এতে আরও বলা হয়েছে, আলোচনার সময় হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা হবে। আর তা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত হবে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) থেকে এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ চলবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে সময় বাড়ানো যেতে পারে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা স্থগিত রাখবে এবং তেহরানের প্রস্তাবকে তিনি আলোচনার জন্য ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, তা ইরানের প্রণীত ১০ দফা পরিকল্পনার ভিত্তিতেই হবে বলে আগেই জানা গিয়েছিল এবং সেই পরিকল্পনা ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রহণ করেছেন বলেও বলা হচ্ছে।
এখন ইরানের ফার্স বার্তাসংস্থার বরাতে ওই ১০ দফার বিস্তারিত প্রকাশ পেয়েছে। সংস্থাটি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এই তথ্য সামনে এনেছে।
প্রস্তাবগুলোতে রয়েছে—
১. ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না— এমন অঙ্গীকার।
২. ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসন পুরোপুরি বন্ধ করার পথ তৈরি করা।
৩. মধ্যপ্রাচ্যসহ এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধরত বাহিনী প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক ঘাঁটি থেকে ইরানের ওপর কোনও হামলা না করা।
৪. দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি, যা ‘সেফ প্যাসেজ প্রটোকল’ এবং ইরানের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হবে।
৫. ইরানের ওপর আরোপিত সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া।
৬. যুদ্ধের কারণে ইরানকে ক্ষতি পূরণ দিতে একটি বিনিয়োগ ও আর্থিক তহবিল গঠন করা।
৭. পারমাণবিক উপাদান সমৃদ্ধ করার ইরানের অধিকারকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়া এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির মাত্রা নিয়ে আলোচনা করা।
৮. এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনার অনুমতি দেয়া।
৯. এই অঞ্চলের সব প্রতিরোধ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনাগ্রাসন নীতি সম্প্রসারণ করা।
১০. সব প্রতিশ্রুতি জাতিসংঘের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা।