বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম
অর্থ-বাণিজ্য

বেনাপোল কাস্টম হাউসে ১৬৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ আসে এই বন্দর থেকে। কিন্তু সম্প্রতিক সময়ে নো-এন্ট্রি পণ্য খালাস, মিথ্যা ঘোষণায় চালান পার করে দেওয়া, শুল্ক ফাঁকি এবং নজরদারির দুর্বলতার একাধিক ঘটনায় আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনায়। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দুর্বল তদারকি এবং অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই চক্রের কারণে সরকার হারাচ্ছেন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, অথচ কার্যকর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুবই সীমিত।
 
বেনাপোল স্থল বন্দরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গেলে আট মাসে ৬৮ হাজার ৮৬টি ট্রাকে মোট পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হয় ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৫২১ দশমিক ৮৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে আমদানি হয় ১১ লাখ ১০ হাজার ৯০৩ দশমিক ৮১ মেট্রিক টন পণ্য ও রপ্তানি হয় এক লাখ ২৪ হাজার ৬১৮ দশমিক ৬১ মেট্রিক টন পণ্য।
 
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৬ হাজার ৫৮২ টি ট্রাকে পণ্য আমদানি হয় এক লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৭ দশমিক ২৯ মেট্রিক টন ও এক হাজার ৭২৩টি ট্রাকে রপ্তানি হয় ১৫ হাজার ৯৭ দশমিক ৯১ মেট্রিক টন পণ্য।ফেব্রুয়ারি  মাসে ৬ হাজার ৩৭৫ টি ট্রাকে পণ্য আমদানি হয় এক লাখ ২৭ হাজার ৩৮ দশমিক ১১ মেট্রিক টন ও এক হাজার ৮৩১টি ট্রাকে রপ্তানি হয় ১৮ হাজার ১৩৩ দশমিক ৫৪৯ মেট্রিক টন পণ্য।
 
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক লাখ ৪৩ হাজার ৩৩৬টি ট্রাকে মোট পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হয় ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৮০ দশমিক ৬৯ মেট্রিক টন পণ্য। এর মধ্যে আমদানি হয় ২০ লাখ ১১ হাজার ২৬৭ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন পণ্য ও রপ্তানি হয় ৪ লাখ ২১ হাজার ৭১৩ মেট্রিক টন পণ্য। এরআগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই লাখ ৫৮ হাজার ১৪১টি ট্রাকে মোট পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হয় ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৫৬৫ মেট্রিক টন পণ্য। এর মধ্যে আমদানি হয় ২০ লাখ ৭৮ হাজার ৪০৮ মেট্রিক টন পণ্য ও রপ্তানি হয় ২০ লাখ ১৫৭ মেট্রিক টন পণ্য।
 
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক ৬৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে বেনাপোল কাস্টমস হাউজে। অথচ এই সময়ে আমদানি কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য কোনো হ্রাসের তথ্য নেই বরং বিভিন্ন সময়ে উ”চমূল্যের পণ্য আমদানি বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মিথ্যা ঘোষণা, কম মূল্যে পণ্য দেখানো, উ”চ শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের নামে আনা এবং ঘুষের বিনিময়ে শুল্কায়ন কমিয়ে দেওয়ার ঘটনাই এই বিপুল রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ।
 
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ই”ছাকৃতভাবে আমদানিকারকদের উ”চ শুল্কের ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন। পরে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার নামে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছেন, অন্যদিকে সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
 
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের ভারত বলেন, অনেক সময় কর্মকর্তারা অযৌক্তিকভাবে বেশি শুল্ক নির্ধারণের ভয় দেখান। পরে সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ নিয়ে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর যারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চান তারা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। 
 
আরেক ব্যবসায়ী মো. বাপ্পি হোসেন বলেন, সব কর্মকর্তা খারাপ নন, কিš‘ একটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে যারা মিথ্যা ঘোষণার পণ্য পার করে দিতে সক্রিয়। যারা অনৈতিক সুবিধা দেয়, তাদের পণ্য দ্রুত  ছাড় হয়।
 
আমদানিকারক হাবিবুর রহমান হবি বলেন, আমরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু অসাধু কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে অসু¯’ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। যারা শুল্ক ফাঁকি দেয় তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে, ফলে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন ।
 
বন্দরে অনিয়মের একাধিক ঘটনার উদাহরণও রয়েছে। গত ১৮ জানুয়ারি ভারত থেকে তিনটি ট্রাকে ৫৬ মেট্রিক টন মোটর পার্টস আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে পরীক্ষায় ঘোষণার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় তিন টন পণ্য পাওয়া যায়। এতে কাস্টমস অতিরিক্ত ২৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যদি এই অতিরিক্ত পণ্য ধরা না পড়ত তাহলে কি তা শুল্ক ছাড়াই বাজারে চলে যেত?
 
এর আগে গত বছরের ২২ ও ২৪ সেপ্টেম্বর প্রায় আড়াই কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রিপিসের একটি চালান বন্দরের নয়টি গেট অতিক্রম করে বাইরে চলে যায়। পরে বিজিবি অভিযান চালিয়ে সেই পণ্য চালান আটক করে। কীভাবে এত উ”চমূল্যের একটি চালান একাধিক নিরাপত্তা স্তর পেরিয়ে বাইরে চলে গেল, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এখনও পাওয়া যায়নি।
 
এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৮৯১টি আইজিএমের বিপরীতে কাস্টমস সিস্টেমে কোনো বৈধ বিল অব এন্ট্রি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ পণ্য প্রবেশের ঘোষণা থাকলেও শুল্ক পরিশোধের কোনো তথ্য নেই। ব্যবসায়ীদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক ক্রুটি নয়, বরং বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে।
 
গত ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মিথ্যা ঘোষণার পাঁচ ট্রাক আমদানি পণ্য ভারতীয় কাস্টমস আটক করে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের অসামঞ্জস্য ধরা পড়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিব্রতকর পরি¯ি’তি তৈরি করে এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
 
নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। বন্দরে স্ক্যানার থাকলেও তা সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। গেট পাস যাচাই, কনটেইনার সিল পরীক্ষা এবং পণ্যের প্রকৃত অব¯’া যাচাই যথাযথভাবে হচ্ছে  কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী জানান, অনেক সময় কাগজপত্রের মিল দেখেই পণ্য ছাড় দেওয়া হয়, বাস্তবে পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করা হয় না।
 
এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, মিথ্যা ঘোষণার বেশ কয়েকটি চালান জব্দ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইনে মামলা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে কাস্টমস জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।
 
অন্যদিকে বেনাপোল স্থল বন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন মিথ্যা ঘোষনার পণ্য আটকের ঘটনা কাস্টমস কতৃপক্ষ স্বীকার করলেও বেনাপোল বন্দর পরিচালক দায় এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ইতিপূর্বে মিথ্যা ঘোষনার পণ্য কয়েক দফায় আটক করা হয়েছে, তা পরবর্তীতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে প্রকৃতঅর্থে সমস্ত পণ্য আনা হয়েছে তা যথার্থ এবং সঠিক ছিলো। 

এই সম্পর্কিত আরো