নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কর্ণফুলী থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নবাগত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনূর আলম দায়িত্ব নেওয়ার দেড় মাসের মধ্যেই খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি, মারামারি ও ভূমি দখলের মতো অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এর আগে কর্ণফুলী এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বাড়লেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের সেই স্থবিরতা ভাঙতে শুরু করেছে নতুন ওসি যোগদানের পর। সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটায় স্থানীয়দের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে মনে করছেন।
নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সিএমপি কমিশনারের নির্দেশনা এবং বন্দর উপ-পুলিশ কমিশনারের তত্ত্বাবধানে স্বল্প সময়েই মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা বাড়ান ওসি শাহীনূর আলম।
এর প্রভাবে কর্ণফুলীর পাঁচ ইউনিয়নে প্রকাশ্য ভয়-আতঙ্ক কমেছে। গ্রাম ও অলিগলিতে রাতে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিক সফলতাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই মাস আগেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাই, চুরি ও মারামারির ঘটনা ঘটত। তবে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
জানা গেছে, গত বছরের ৬ ডিসেম্বর কর্ণফুলী থানায় যোগ দেন ওসি শাহীনূর আলম। এর আগে তিনি সিএমপি খুলশী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যোগদানের পর মাত্র ৫৭ দিনের মধ্যে অপরাধ দমনে উল্লেখযোগ্য তৎপরতা দেখা গেছে।
আদালত প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, এ সময়ে কর্ণফুলী থানায় দ্রুত বিচার আইনে ১টি, মাদক মামলায় ৫১টি, চুরি ৮টি, অস্ত্র ১টি, বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২টি, দস্যুতা আইনে ১টি, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ৪টি এবং বিবিধ আইনে ১৮টিসহ মোট ৮৬টি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি ওয়ারেন্টভুক্তসহ বিভিন্ন মামলায় ৫৪ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিয়মিত মামলাসহ মোট মামলা দাঁড়িয়েছে ২৮৫টিতে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংখ্যাগত সাফল্যের পাশাপাশি পুলিশের প্রতি জনআস্থার সংকট কাটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কয়েকদিন পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকায় আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি ঘটে।
সে সময় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এতে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও দ্বিধা তৈরি হয়, যার সুযোগ নেয় অপরাধচক্র।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ কাজে ফিরলেও মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে কিছুটা সময় লেগেছে। ফলে শুরুতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। তবে কর্ণফুলীতে সাম্প্রতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—পরিস্থিতি আর অবনতির পথে নেই।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানার ওসি শাহীনূর আলম বলেন,“আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। সিএমপি কমিশনার স্যারের দিকনির্দেশনায় পুলিশের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য, যাতে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়।”
চট্টগ্রামের আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বলেন, "আন্দোলনের সময় পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বাহিনীটি নৈতিক সংকটে পড়েছিল—এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে বর্তমানে কর্ণফুলীসহ চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতায় অপরাধ কমতে শুরু করেছে, এটিও বাস্তবতা।”
সব মিলিয়ে, কর্ণফুলীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পথে থাকলেও পুলিশের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা পুরোপুরি কাটাতে সময় ও ধারাবাহিক কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কর্ণফুলী থানা এলাকা ও উপজেলায় আপাতত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘সন্তোষজনক’ বলেই দাবি পুলিশের। এখন পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থানা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখছেন—যা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।