শেখ হাসিনার পিয়ন জাহাঙ্গীরের ফ্ল্যাট-জমি জব্দ, স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ

Posted on January 20, 2026

কর্পোরেট সংবাদ ডেস্ক: মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী (পিয়ন) জাহাঙ্গীর আলমের ফ্ল্যাট ও জমি জব্দ এবং তার স্ত্রী কামরুন নাহারের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুদকের পৃথক দুটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ এই আদেশ দেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন বাসস’কে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আদালতের আদেশে জাহাঙ্গীর আলমের নামে থাকা নোয়াখালী জেলায় ৩৫ শতক জমি এবং ঢাকার মিরপুরে ১ হাজার ৩৮৫ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে থাকা ৭টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে ১ কোটি ৩ লাখ টাকা জমা রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আবেদনে বলা হয়, তিনি নিজের নামে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি ও তার মালিকাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৮টি ব্যাংকের ২৩টি হিসাবে মোট ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলন করেছেন। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। তদন্ত চলাকালে এসব সম্পদ সরিয়ে ফেলার বা মালিকানা পরিবর্তনের আশঙ্কা থাকায় তা ক্রোক (জব্দ) করা প্রয়োজন।

কামরুন নাহারের বিষয়ে আবেদনে বলা হয়, তিনি একজন গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের সহায়তায় নিজের নামে ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। তিনি দুটি ব্যাংকের ৪টি শাখার ৭টি হিসাবে সঞ্চয়ী ও ডিপিএস হিসাব খুলে ৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলন করেছেন। এ ঘটনায় দুদক মামলা দায়ের করেছে, যা তদন্তাধীন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, তদন্তকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কামরুন নাহারের নামে থাকা অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাবে বিদ্যমান অর্থের হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার নামে অর্জিত অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের পিয়নের ৪০০ কোটি টাকার মালিক হওয়ার তথ্য দেন। শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের একপর্যায়ে বলেন, “আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। বাস্তব কথা। কী করে বানাল এত টাকা? জানতে পেরেছি, পরেই ব্যবস্থা নিয়েছি।”

সাবেক সরকারপ্রধান সেই কর্মীর নাম না বললেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর তার ব্যাংক হিসাব স্থগিতের নির্দেশ আসে। জাহাঙ্গীর আলম শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময়ও জাহাঙ্গীর আলম তার ‘ব্যক্তিগত স্টাফ’ হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার জন্য যে খাবার পানি বাসা থেকে নেওয়া হত, তা বহন করতেন জাহাঙ্গীর। সে কারণে তিনি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিতি পান।

জাহাঙ্গীরের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নে। তিনি এর আগে চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরমও তুলেছিলেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। তবে পরে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে তদবির করে তিনি ‘কোটি কোটি টাকার’ মালিক হয়েছেন এবং নোয়াখালী ও ঢাকায় ঢাকায় বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জাহাঙ্গীরের বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়, তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

জুলাইয়ের তুমুল গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা জানায় দুদক।