Corporate Sangbad | Online Bangla NewsPaper
সম্পাদকীয়

বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের নেপথ্যের কারিগর

সাধন চন্দ্র মজুমদার : বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল তার এক কবিতায় লিখেছেন, ‘এ বিশ্বের যতকিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের ইতিহাস। এ ইতিহাস একটি কল্যাণকর ইতিহাস। এ ইতিহাস মহান করেছে বাঙালি জাতিকে। কল্যাণকর এ ইতিহাসের পেছনে এক মহীয়সী রমণীর কথা কোনোদিনই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। হ্যাঁ? তিনি হচ্ছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছার জন্ম ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট। তদানীন্তন গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) টুঙ্গিপাড়ায় রেণু নামের মেয়েটিই পরবর্তী সময়ে ‘বঙ্গমাতা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে কিছু লিখতে গিয়ে নানা কথা স্মৃতিপটে হানা দেয়। নিয়তির বিধান অনুযায়ী প্রতিটি মানুষকেই মৃত্যুবরণ করতে হয়। কিন্তু কেউ কেউ মরে গিয়েও বেঁচে থাকেন তার কর্মের মধ্যে। সে মহৎ কর্ম মানুষের হৃদয়কে প্রসারিত করে। হৃদয়মন্দিরে অমিয় শিখা প্রজ্বলিত থাকে সর্বক্ষণ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমরা বাঙালি জাতি শতাব্দীর পর শতাব্দী পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলাম। কিছু সামন্তবাদী ক্ষমতা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না আমাদের। সেই রাজনৈতিক অধিকার বা ক্ষমতা অর্জনের জন্য সুদীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের পথ অতিক্রম করতে হয়েছে, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। সংগ্রামে অবারিত উত্সাহ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খ্যাতির শিখরে উঠেছেন, তার পেছনে এক সুদক্ষ কারিগর হিসেবে তারই সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সুখী-সমৃদ্ধিশালী দাম্পত্য জীবনের অনুশীলন অনেকাংশে বিসর্জন দিয়ে একটি জাতিকে সমৃদ্ধকরণে কাজ করে গেছেন মুজিব-ফজিলাতুন নেছা দম্পতি।

শেখ মুজিব তার কর্মকুশলতায় তদানীন্তন পাকিস্তানের বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে আসীন হন। তার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি তার ঠিকানা খুঁজে পায়। শেখ মুজিবের এই সাহসী নেতৃত্ব এমনিতে গড়ে ওঠেনি। সুযোগ্য সহধর্মিণী বেগম মুজিব তাকে সহযোগিতা করে গেছেন। রাজনৈতিক কারণে শেখ মুজিবকে জেল-জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। বেগম মুজিব এতটুকু ঘাবড়ে যাননি সেজন্য। উপরন্তু তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণায় শেখ মুজিবকে দেশব্যাপী ঘুরে বেড়াতে হতো। জনগণকে মুক্তির পথ দেখাতে ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করেছেন। বেগম মুজিব ঘরসংসার রক্ষার পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদেরও মাতৃস্নেহে আগলে রাখতেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ছিল বাঙালি জাতির শেষ ঠিকানা। নেতাকর্মীর ভিড় লেগে থাকত সব সময়। বেগম মুজিব কখনো বিরক্ত বোধ না করে নেতাকর্মীদের আদর-যত্নে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি দেশ ও জাতিকে নিজের পরিবারের সদস্যদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন।

একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির ১৭ তারিখে আট দলীয় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ পশ্চিম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি (রাজধানী) পৌঁছান (বঙ্গবন্ধু তখন জেলখানায়)। নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, জুনিয়র সহসভাপতি খন্দকার মোশতাক (যিনি পরবর্তীতে বিশ্বাসঘাতক মিরজাফর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন), এইচ এম কামারুজ্জামান, ময়েজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকে ছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। এতে বৈঠক স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবকে বৈঠকে যোগদানের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কোর্টের সম্মতিসাপেক্ষে প্যারোলে (সাময়িক) মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। এ খবরটি বেগম মুজিব আসামিপক্ষের আইনজীবীর কাছ থেকে শুনতে পান। শুনে বেগম মুজিব ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হন। কেননা তিনি তার প্রিয়তম স্বামীর প্যারোলে মুক্তি প্রত্যাশা করেননি। এদিকে শেখ মুজিব এ বিষয়ে মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে তিনি স্বামীর কাছে বার্তা পাঠালেন। বেগম ফজিলাতুন নেছা উপলব্ধি করেছিলেন ফুঁসে ওঠা গোটা বাঙালি জাতি শেখ মুজিবের মুক্তি চায়, কিন্তু প্যারোলে নয়। কারণ প্যারোলে মুক্তির বিধান অনুসারে মুচলেকা দিয়ে নিতে হয়। মুচলেকা মানেই নতি স্বীকার করা। বেগম মুজিব চাইতেন তার স্বামী যেন পাকিস্তানি জান্তা শাসকের কাছে নতি স্বীকার না করেন। তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ মুজিবকে মুক্তি না দেওয়া ছাড়া জান্তা শাসকের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তার পাঠানো বার্তায় মুসা ভাইয়ের বর্ণনা এরকম—‘প্যারোলে মুচলেকা দিয়ে আইয়ুবের দরবারে যেতে পারেন, কিন্তু জীবনে ৩২ নম্বরে আসবেন না।’ শেখ ফজিলাতুন নেছার এই বার্তার কারণে শেখ মুজিব দ্বিধাদ্বন্দ্ব মুক্ত হন। কতটা স্থিত-প্রাজ্ঞ দূরদর্শী হলে এ রকম বার্তা জেলখানায় অবস্থানরত শেখ মুজিবকে দিতে পারেন। বেগম মুজিবের দেশপ্রেমের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি শেখ মুজিবকে সব সময় প্রভাবিত করেছে।

বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব শৈশবে পিতামাতা হারান। তার ডাকনাম ছিল ‘রেণু, যা আগে উল্লেখ করেছি। অসহায় এতিম এই বালিকার দায়িত্বভার তুলে নেন শেখ মুজিবের পিতা-মাতা। বালিকা বয়সেই শেখ মুজিবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় বাল্যবিবাহ কোনো দোষের ছিল না। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই এ ধরনের বিয়ে হয়ে থাকত। যাহোক, শৈশব থেকেই ফজিলাতুন নেছার (রেণু) মধ্যে ভালোবাসা, সহানুভূতি আন্তরিকতা অন্যের জন্য মমত্ববোধ ইত্যাদি গুণাবলি প্রকাশ পায়, যা অন্য সাধারণ মেয়ের মধ্যে দেখা যেত না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন লেখার মধ্যে যেসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, তা থেকে অনুমিত হয় যে, কর্তব্যপরায়ণতা, স্নেহময়ী মাতা, মমতাময়ী জননী এ ধরনের গুণরাশিতে সমৃদ্ধ ছিল তার চরিত্র। শেখ মুজিব যখন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে দেশে এবং দেশের বাইরে পরিচিতি পান তখন প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপে সতর্কতা অবলম্বনে পরামর্শ দিতেন বেগম মুজিব। বঙ্গবন্ধু সাহসী ছিলেন, পাশাপাশি প্রচণ্ড আবেগপ্রবণও ছিলেন। আবেগের বশবর্তী হয়ে যাতে কোনো ভুল পথে পা পিছলে না পড়েন, সেদিকটায় সব সময় খেয়াল রাখতেন তার সহধর্মিণী। বঙ্গবন্ধুর নিশানা ছিল বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে ছাড়বেন। সেই নিশানায় পৌঁছতে বেগম মুজিব পথ দেখিয়ে গেছেন।

স্বাধীনতা আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে ১৯৭১ সালে। এ বছর মার্চ মাসে বাঙালি উত্তাল আন্দোলনে দেশকে কাঁপিয়ে তুলছে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনার অপেক্ষায়। ৭ মার্চের লক্ষ লক্ষ জনতার সমাবেশে বঙ্গবন্ধুকে ভাষণের জন্য নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন পরামর্শ দিতে থাকেন। কিন্তু বেগম মুজিবের পরামর্শ ছিল কারো কথায় নয়, বঙ্গবন্ধুর মন থেকে যা আসে, তিনি যেন জনগণকে সেটাই বলেন। বাঙালি কী চায়, এটা বঙ্গবন্ধু ভালোই জানতেন। জনতার প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন ৭ মার্চের ভাষণে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ জাতিসংঘে ইউনেসকোর রেকর্ডে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে স্থান লাভ করেছে। এ ভাষণের পেছনেও বঙ্গমাতার পরামর্শ ছিল।

বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা—তার সহধর্মিণী হিসেবে শেখ ফজিলাতুন নেছা ‘বঙ্গমাতা’ খেতাব পেয়েছেন এ ধারণাটি অমূলক। বেগম মুজিব তার কর্মগুণেই এ খেতাব লাভ করেছেন। উল্লেখ্য, তখনকার সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শেখ ফজিলাতুন নেছা প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি; কিন্তু অসাধারণ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী ছিলেন তিনি। ভালোবাসা ও স্নেহের প্লাবনে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন গোটা বাঙালি জাতিকে। শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে নিয়ে যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এই মহীয়সী রমণী ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন। আর এ আগস্ট মাসেই তার জন্ম হয়। শোকাবহ মাসে তার জন্মকথা লিখতে হয়। এটা নিয়তির বিধান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেগম মুজিব এ জাতির কল্যাণময় চিন্তায় মগ্ন থেকে জাতির পিতাকে আনন্দময় সমৃদ্ধিশালী দেশ বিনির্মাণে প্রেরণা জুগিয়ে গেছেন। তিনি রক্ত দিয়ে ঋণী করে গেছেন আমাদের।

লেখক : খাদ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

আরো খবর »

বিজয়ের আকাঙ্খা : প্রতিষ্ঠিত হোক জাতীয় ঐক্য

উজ্জ্বল হোসাইন

শেখ হাসিনা, জীবন যেন এক ফিনিক্স পাখির গল্প

উজ্জ্বল হোসাইন

৪ ধাপে তালিকাভুক্ত কোম্পানির এজিএম হওয়া প্রয়োজন

উজ্জ্বল হোসাইন