কনফিডেন্স সিমেন্টের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ

Posted on October 3, 2023

শেয়ারবাজার ডেস্ক: কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের কোম্পানি কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে। কোম্পানিটি কর ফাাঁকি দিতে আয়কর আইন-বহির্ভূতভাবে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা হস্তান্তর করেছে এবং কাঁচামাল ও মেশিনারিজের মূল্য ৫৯ কোটি টাকা কম দেখিয়েছে। কোম্পানিটির প্রদেয় কর আদায় করতে কর অফিসকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রমতে, কর পরিদর্শন পরিদপ্তর কর অঞ্চল-১, চট্টগ্রামের সার্কেল-৭ (কোম্পানিজ) ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের পরিদর্শন প্রতিবেদন দেয়ার উদ্যোগ নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই সার্কেলের পাঁচটি কোম্পানি ও একজন করদাতার আয়কর নথি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়া হয়, যাতে কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের আয়কর নথি যাচাই করে অনিয়ম উঠে আসে।

কর পরিদর্শন পরিদপ্তর থেকে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনফিডেন্স সিমেন্টের ২০২১-২২ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন যাচাই করা হয়েছে। রিটার্নে ইক্যুইটি খাতে ‘রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাস’ এবং ‘রিটেইন আর্নিংস’-এ (৪৩৬,৮৯,২৯,৬১৮-৩৪১,৭৪,১৫,৪৬৭) বা ৯৫ কোটি ১৫ লাখ ১৪ হাজার ১৫১ টাকা হস্তান্তর করা হয়েছে। করদাতা কোম্পানির পূর্ববর্তী করবর্ষের কর পরিশোধিত নিট আয় দেখানো হয়েছে ৪৭ কোটি ৪৫ লাখ ২১ হাজার ১৯৮ টাকা। ‘আয়কর আইন, ২০২৩’-এর ২২ ধারা অনুযায়ী, করদাতা কোম্পানি ৩৩ কোটি ২১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৩৮ টাকা রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাস এবং রিটেইন আনিংসে হস্তান্তর করতে পারবে।

২২ ধারায় বলা হয়েছে, সংরক্ষিত আয় (রিটেইন আর্নিংস, সঞ্চিতি (রিজার্ভ), উদ্বৃত্ত (সারপ্লাস) ইত্যাদির ওপর করারোপÑএই আইন বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, যদি কোনো করবর্ষে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর (১৮ নং আইন) অধীনে নিবন্ধিত এবং বাংলাদেশ স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি কর্তৃক সংরক্ষিত আয়ে অথবা কোনো তহবিল, সঞ্চিতি বা উদ্বৃত্তে যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, পূর্ববর্তী করকর্ষের কর পরিশোধিত নিট আয় হতে অর্থ স্থানান্তর করিয়া থাকে এবং এই স্থানান্তরিত অর্থের পরিমাণ পূর্ববর্তী করবর্ষে কোম্পানি কর্তৃক যেই পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে, তার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রদেয় হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনফিডেন্স সিমেন্ট কোম্পানি আয়কর আইন-বহির্ভূতভাবে ৯৫ কোটি ১৫ লাখ ১৪ হাজার ১৫১ টাকা রিজার্ভ অ্যান্ড সারপ্লাস এবং রিটেইন আর্নিংসে হস্তান্তর করেছে। ২২ ধারা অনুযায়ী ২০২০-২১ করবর্ষে আইন বহির্ভূতভাবে হস্তান্তর করা এই টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে ৯ কোটি ৫১ লাখ ৫১ হাজার ৪১৫ টাকা কর আদায় করতে হবে।

অন্যদিকে কনফিডেন্স সিমেন্টে ২০২১-২২ করবর্ষের রিটার্নে আমদানি কাঁচামাল ও মেশিনারিজ খাতের যে ব্যয় বা মূল্য দেখানো হয়েছে, সেখানেও অনিয়ম পেয়েছে পরিদর্শন পরিদপ্তর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন বা অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১-২২ করবর্ষে মোট ২৭৯ কোটি ২২ লাখ ৫২ হাজার ৫৬৩ টাকার কাঁচামাল আমদানি দেখানো হয়েছে। এছাড়া স্থায়ী সম্পদ সংযোজনে প্ল্যান্ট অ্যান্ড মেশিনারিজ খাতে আমদানি করা ক্যাপিটাল মেশিনারিজের মূল্য দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭৬৫ টাকা। কাঁচামাল ও মেশিনারিজের মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ২৯২ কোটি ৫৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩২৮ টাকা।

পরিদর্শন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থেকে কনফিডেন্স সিমেন্টের ২০২১-২২ করবর্ষের আমদানির তথ্য যাচাই করেছে। এতে দেখা গেছে, ২০২১-২২ করবর্ষে কোম্পানির আমদানি করা কাঁচামাল ও মেশিনারিজের মোট মূল্য ৩২৪ কোটি ৮৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৩০ টাকা। সে হিসেবে করদাতা কোম্পানি ওই করবর্ষে কাঁচামাল ও মেশিনারিজের মূল্য কম দেখিয়েছে (৩২৪,৮৩,৭৫,৫৩০-২৯২,৫৫,৪৪,৩২৮) ৩২ কোটি ২৮ লাখ ৩১ হাজার ২০২ টাকা। প্রতিষ্ঠান করফাঁকি দিতে কম মূল্য দেখিয়েছে। আয়কর আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী, ৩২ কোটি ২৮ লাখ ৩১ হাজার ২০২ টাকার ওপর ৫০ শতাংশ হারে ১৬ কোটি ১৪ লাখ ১৫ লাখ ৬০১ টাকা কর প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হবে।

অন্যদিকে কনফিডেন্স সিমেন্ট ২০২০-২১ করবর্ষেও ২০২১-২২ করবর্ষের মতো একইভাবে কাঁচামাল ও মেশিনারিজের মূল্য কম দেখিয়ে অনিয়ম করেছে। রিটার্নে যাচাইয়ে দেখা গেছে, কোম্পানি দাখিল করা বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ করবর্ষে কাঁচামাল আমদানি দেখানো হয়েছে ২৪৭ কোটি ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৯ টাকা। এছাড়া প্লান্ট মেশিনারিজ খাতে আমদানি করা ক্যাপিটাল মেশিনারিজ দেখানো হয়েছে আট কোটি ৯০ লাখ ১১ হাজার ৫৩৬ টাকা। ওই করবর্ষে আমদানি কাঁচামাল ও মেশিনারিজ দেখানো হয়েছে মোট ২৫৬ কোটি তিন লাখ ৭৫ হাজার ১৬৫ টাকা।

কর কর্মকর্তারা এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড থেকে ২০২০-২১ করবর্ষের প্রতিষ্ঠানের আমদানির তথ্য নিয়েছে, যাতে দেখা গেছে, কোম্পানি ওই করবর্ষে মোট ২২৯ কোটি ছয় লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৬ টাকা কাঁচামাল ও মেশিনারিজ আমদানি করেছে। সে হিসেবে ওই করবর্ষে কোম্পানি কাঁচামাল ও মেশিনারিজ খাতে কম দেখিয়েছে, (২৫৬,০৩,৭৫,১৬৫-২২৯,০৬,৬৮,৩৫৬) ২৬ কোটি ৯৭ লাখ ৬ হাজার ৮০৯ টাকা। আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী এর ওপর ৫০ শতাংশ হারে প্রযোজ্য কর ১৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪০৪ টাকা। এসব অনিয়ম করায় ২১৩ ধারা অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করতে কর অফিসকে প্রতিবেদনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে অন্যান্য কয়েকটি অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোম্পানি করদাতা ২০২১-২২ করবর্ষে সিমেন্ট প্লান্ট খাতে ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ে চার কোটি ৫৬ লাখ চার হাজার ৮০৮ টাকা; ফার্নিচার-ফিক্সার ও অফিস ইক্যুইপমেন্ট খাতে ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৮৩৫ টাকা ও রেডিমিক্স প্লান্ট খাতে ৯৪ হাজার ৮১৮ টাকা প্রদর্শন করেছে।

এছাড়া একই করবর্ষে সিমেন্ট প্লান্ট ও রেডিমিক্স খাতে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ক্রয় দেখিয়েছে ১৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩ হাজার ৬৭৮ টাকা। প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল খাতে ক্রয় দেখিয়েছে ২৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার ৯৩৫ টাকা। কিন্তু কোনো খাতে উৎসে কর কর্তন করেনি।

একইভাবে ২০২০-২১ করবর্ষে সিমেন্ট প্লান্ট হেডের ফ্যাক্টরি বিল্ডিং খাতে এক কোটি ২২ লাখ এক হাজার ৩৭০ টাকা, ফার্নিচার-ফিক্সার ও অফিস ইক্যুইপমেন্ট খাতে এক কোটি তিন লাখ ছয় হাজার ৭৩৯ টাকা, রেডিমিক্স প্লান্ট হেডের ফার্নিচার-মিক্সার ও অফিস ইক্যুইপমেন্ট খাতে ১৫ লাখ ৭২ হাজার ২৮৮ টাকা, সিমেন্ট প্লান্ট ও রেডিমিক্স খাতে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ক্রয় ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৭ টাকা ও ১৩ কোটি ৭২ লাখ ২০ হাজার ৪৯ টাকা, প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল খাতে ক্রয় ১৯ কোটি ৮৮ লাখ ৩২ হাজার ৯৯৬ টাকা দেখিয়েছে। কিন্তু কোনো খাতে উৎসে কর কর্তন করেনি। উৎসে কর কর্তন না করায় ২১৩ ধারা অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করতে কর অফিসকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সংবাদ সূত্র: শেয়ারবাজার নিউজ২৪

কর্পোরেট সংবাদ/ এএইচ