খেলাধূলা

ইংল্যান্ডের ‘টেস্ট ক্রিকেট বিপ্লবের’ ৫ কারণ

স্পোর্টস ডেস্ক : ইংল্যান্ড শুধু টেস্ট ক্রিকেট খেলছেই না, টেস্ট ক্রিকেটকে যেন বিনোদনের উপলক্ষ্য করে তুলছে এই দলটি- ৩৭৮ রানের লক্ষ্য দেয়ার পরেও ভারত এজবাস্টনে নিরাপদ বোধ করেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর এবারে ভারতের বিপক্ষে এজবাস্টন টেস্টও দাপটের সাথে জিতে নিলো ইংল্যান্ড।

ক্রিকেট বিশ্লেষক হারশা ভোগলে টুইটারে লিখেছেন, ৩৬৫ বা তার বেশি টার্গেট কোন দল টেস্ট ক্রিকেটে দেয়া মাত্রই তারা সাধারণত জয়ের পথে এক পা দিয়ে রাখে, কিন্তু এই ইংল্যান্ড দলটা অসাধারণ।

সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে ইংল্যান্ড শুরু করেছে ‘ইংলিশ টেস্ট ক্রিকেটের নতুন যুগ’। কী ছিল না সেখানে- ১৪১ রানে অলআউট হয়েও ২৭৭ রান তাড়া করে টেস্ট জয়। ৫০ ওভারে ২৯৯ রান তাড়া করে টেস্ট জয়। শেষ টেস্টে মাত্র ৫৪ ওভারে ২৯৬ রান তাড়া করে টেস্ট জয়। ভারতের ক্রিকেটার দিনেশ কার্তিক লিখেছেন, ইংল্যান্ড যেন টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন রূপে সংজ্ঞায়িত করছে।

“আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য, চোখের জন্য দারুণ,” লিখেছেন দিনেশ কার্তিক। এই ঘরানার ক্রিকেটের একটা নামও রাখা হয়েছে- বাজবল।

কোচ যেভাবে বদলে দিলেন চেহারা
বাজ মূলত ইংল্যান্ডের নতুন টেস্ট ক্রিকেট কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ডাকনাম। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ ছিল টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিজ্ঞাপন, সেই ম্যাচে ভারতের বর্তমান কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিপক্ষে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে ইংল্যান্ডের বর্তমান টেস্ট কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ৭৩ বলে ১৫৮ রানের একটি ইনিংস খেলেছিলেন। সেটা ছিল আইপিএলের জন্য একটা বড় পাওয়া।

ম্যাককালাম নিজের অধিনায়কত্বে ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডকে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালেও তুলেছিলেন। যে কোনও দলকে আত্মবিশ্বাস জোগাতে “ম্যাককালাম নিজেই একজন টোটকা” বলে মনে করেন ক্রিকেট বিশারদরা। টেস্ট ক্রিকেটে পঞ্চম দিনে যে ২৫০-৩০০ রান তাড়া করা যায় এই বিশ্বাস ইংল্যান্ড দলকে দিয়েছেন দায়িত্ব নেয়ার সাথে সাথে।

ফলও পেয়েছেন, খেলোয়াড়ি জীবনেও একই রকম ছিলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট ম্যাচেই ৫৪ বলে শতক হাঁকিয়েছিলেন তিনি। ব্রেন্ডন ম্যাককালামের সেই ইনিংস এখনো টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের দ্রুততম শতক।

ভারতের ব্যাটিং বিশ্লেষক ও সাবেক ক্রিকেটার ওয়াসিম জাফরের মতে, “ইংল্যান্ডের মানসিকতাই বদল গেছে ম্যাককালাম দায়িত্ব নেয়ার পর।”

যেমন ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচটাকেই উদাহরণ হিসেবে নেয়া যায়, এই সিরিজটি মূলত গত বছর সম্পন্ন না হওয়া টেস্ট সিরিজের শেষ ম্যাচ, যেখানে চতুর্থ টেস্টে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল ৩৬৮ রান, সেবারও ০ রানে ১০০ থেকে ১৫৭ রানে ম্যাচটি হেরে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। এবারের আগে এজবাস্টনে সর্বোচ্চ ২৮১ রান তাড়া করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এবার এক লাফে সেটা দাঁড়ালো ৩৭৮ রানে।

বেন স্টোকসের অধিনায়কত্ব
ম্যাককালামের কোচিংয়ের সাথে যোগ হয়েছে এই টেস্ট দলের নেতা হিসেবে বেন স্টোকসের আবির্ভাব। ইংল্যান্ডের পুরুষ ক্রিকেট দলের টিম ডিরেক্টর রব কী এই দুজনকে যেন দায়িত্ব দিয়েছেন টেস্ট ক্রিকেটে বিপ্লব ঘটাতে।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে তিন ম্যাচ টেস্ট সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের স্পিনার দুই ইনিংস মিলিয়ে দশ উইকেট নেয়ার পর ইংল্যান্ডের স্পিনার জ্যাক লিচ বিবিসি স্পোর্টকে বলেছিলেন বেন স্টোকস তাকে বদলে দিয়েছে।

চতুর্থ দিনের খেলা শেষে লিচ বেন স্টোকসকে নিয়ে বলেছিলেন, “অধিনায়ক হিসেবে স্টোকসের চিন্তা পরিস্কার। এটা আমাকে বল করতে সাহায্য করে। তার পরিকল্পনা আছে, আমরা তার পরিকল্পনা মেনে চলি। সে অধিনায়ক হিসেবে যা করছে তা অবিশ্বাস্য।” এই ক’দিন আগেও ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের অবস্থা ছিল করুণ। গত বছর নয়টি টেস্ট হেরে প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশের এক বছরে নয়টি টেস্ট হারার রেকর্ড ছুঁয়েছিল ইংল্যান্ড।

জনি বেয়ারস্টোর টি-টোয়েন্টি স্টাইলে টেস্ট ব্যাটিং
ভারতের সাথে এজবাস্টন টেস্টে শতকসহ গত পাঁচ ইনিংসে চারটি শতক হাঁকালেন জনি বেয়ারস্টো। নটিংহ্যামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৯২ বলে ১৩৬ রানের ইনিংস দিয়ে শুরু, এরপর লিডসে ১৫৭ বলে ১৬২ এবং চলতি টেস্টেই দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে বেয়ারস্টো ৩২৮ বলে ৩৯৪ রান তুলেছেন, টেস্ট ক্রিকেটে তো বটেই যে কোন ফরম্যাটের ক্রিকেটে এটা কঠিন কাজ। একমাত্র শহীদ আফ্রিদি ২০০৫-০৬ মৌসুমে ভারতের বিপক্ষে ২৭২ বলে ৩৩০ রান তুলেছিলেন পাকিস্তানের মাটিতে একটি টেস্ট সিরিজে।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ইংল্যান্ড প্রতি ওভারে সাড়ে চারের ওপর রান তুলেছে, এই বেয়ারস্টোর ক্ষিপ্রতার কারণেই। মূলত বেন স্টোকসের সিদ্ধান্তেই বেয়ারস্টো এক ধাপ ওপরে ব্যাট করা শুরু করেছেন এবং সাথে সাথেই ফল পেয়েছে দল।

জো রুটের ধারাবাহিকতা
গত পাঁচ বছরেই ইংল্যান্ডের সদ্য সাবেক টেস্ট অধিনায়ক জো রুট প্রায় পাঁচ হাজারের মতো রান করেছেন। অর্থাৎ প্রতি বছরই তিনি প্রায় এক হাজার রান তুলেছেন। তিনি টেস্ট ক্রিকেট র‍্যাংকিংয়ে ব্যাটসম্যানদের তালিকায় এক নম্বরে আছেন।

অধিনায়ক হিসেবে শেষ বছরটা ভালো যায়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে হারের পর অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন রুট। তবে এতে ব্যাটিংয়ের ধার কমেনি। নতুন অধিনায়কের অধীনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটো সেঞ্চুরি তুলেছেন জো রুট। এক ম্যাচে ৮৬ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়েছেন। ২০২১ সাল থেকে জো রুটের টেস্ট ব্যাটিং গড় ৬০ এর ওপর।

নতুন ক্রিকেট ডিরেক্টর রবার্ট কী’র বিচক্ষণতা
এপ্রিল মাসেই ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আসে। তার মধ্যে একটি অ্যাশলে জাইলসের পরিবর্তে পুরুষ ক্রিকেটের পরিচালকের দায়িত্ব পান আরেক সাবেক ক্রিকেটার রবার্ট কী। দায়িত্ব পেয়েই ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে ‘সাধারণ কিন্তু বিস্তৃত’ পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন তিনি।

তিনি দায়িত্ব নেয়ার আগে ইংল্যান্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় আসরের পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে ছিল, তখনও টেস্ট দলের অধিনায়ক ঘোষণা হয়নি, নতুন কোচ হিসেবে কে আসছেন তাও জানা যায়নি। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকে ‘পুনরায় জীবিত করার’ যে পরিকল্পনা ও আশা নিয়ে পরিচালকের পদে বসেছিলেন সেটা আপাতত সফল বলেই মনে হচ্ছে।

রব কী, দায়িত্ব পেয়েই বলেছিলেন, “আমরা ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের সেরা যুগ হতে চাই।” সেই হিসেবে এটা মাত্র শুরু।

রব কী’কে ধন্যবাদ দিচ্ছেন সাবেকরা। নাসের হুসেইন বলেছিলেন, “আমি খুবই খুশি যে রব কী এসেছেন। স্কাই স্পোর্টসে আমি তার সাথে কথা বলেছি ছয় বছর। তিনি ক্রিকেটটা ভালো বোঝেন। আমি মনে করি ইংল্যান্ড খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” আপাতত, সেটাই মনে হচ্ছে। সূত্র-বিবিসি।

আরো খবর »

ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও নাম নেই মেসি-নেইমারের

Arif Hasan

দেশে ফিরেছেন সাকিব, বিসিবির সঙ্গে বৈঠক আজ

উজ্জ্বল হোসাইন

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্থগিত ম্যাচ খেলবে না ব্রাজিল

উজ্জ্বল হোসাইন