আর্কাইভ নির্বাচিত কলাম

কমপ্লাইন্স অডিটে দ্বৈতনীতি ও অডিটরের মেয়াদ কেয়ামত চুক্তি কেন?

মো: মিজানুর রহমান, এফসিএস : ২০১৮ সালে বিএসইসি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড ২০১৮ এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সকল কোম্পানির জন্য কমপ্লাইন্স অডিট বাধ্যতামুলক করে নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনায় সিএ/সিএমএ/সিএস প্র্যাক্টিসিং প্রোফেশনাল ফার্মকে দিয়ে কমপ্লাইনস অডিট করানোর জন্য প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু কোন অডিট ফার্ম একটানা কয় বছর পরপর কমপ্লাইন্স অডিট করতে পারবে সে ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেয়া নেই।

এর আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০০৬ সালে প্রথম কর্পোরেট গভর্নেন্স গাইডলাইন নামে কিছু নির্দেশনা দিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য রুল ইস্যু করে। তারপর ২০১২ সালে আবার কিছু সংশোধনীসহকারে নতুন কর্পোরেট গভর্নেন্স গাইডলাইন ২০১২ ইস্যু করে। ২০১২ এর কর্পোরেট গভর্নেন্স গাইডলাইনে প্রথম সিজি সার্টিফিকেট নেওয়া প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু সেখানেও কমপ্লাইন্স অডিটরের কোন মেয়াদ উল্লেখ করা ছিলো না। ফলে যেসকল কমপ্লাইন্স অডিট ফার্ম ২০১২ সালে কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কমপ্লাইন্স অডিটের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন তারাই ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছয় বছর এবং ২০১৮ থেকে ২০২২ চার বছর অর্থাৎ একই অডিট ফার্ম ১০ বছর তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানিকে অডিট করে যাচ্ছে।

বিএসইসির বর্তমান কমিশনও কমপ্লাইন্স অডিটের ক্ষেত্রে দেয়া এই কেয়ামত চুক্তি বহাল রেখেছে। বিএসইসির যে কমিশন ২০১২ সালে কমপ্লাইন্স অডিটরের কাছ থেকে সিজিসি সার্টিফিকেট দেয়া কেয়ামত চুক্তি করার সুযোগ রেখে গেল সেই একই কমিশন নিজেদের ভুল সংশোধন না করে ২০১৮ সালে আবার কমপ্লাইন্স অডিট ফার্মের জন্য কেয়ামত চুক্তির সুযোগ রেখে কর্পোরেট গভর্নেন্স কোর্ড ২০১৮ পালনের জন্য সকল তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বাধ্যতামুলক রেখে গেছেন।বিএসইসির বর্তমান কমিশন ২০২০ সালে পুনর্গঠিত হলেও বিগত ২ বছরে তারাও কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড ২০১৮ তে কমপ্লাইন্স অডিটরের কোন মেয়াদ নির্ধারণ করে দেননি। অর্থাৎ ২০১২ সালের ভুলের পুনরাবৃত্তি হলো ২০১৮ সালে যা ২০২০ এর কমিশন এখনও বইয়ে বেড়াচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের আগে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটও কেয়ামত চুক্তি ছিলো। তারপর অনেক বড় খেসারত দিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের মেয়াদ পরপর ৩ বছর করা হয়েছে। যেন কোন অডিটর একটানা ৩ বছরের বেশি কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিটর থাকতে না পারে এবং তারপর থেকেই ফাইন্যান্সিয়াল অডিটে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরি হয়েছে। অডিট ফার্মগুলোও কোয়ালিফাইড অডিট রিপোর্ট দিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে।

এখানে প্রশ্ন হলো, কাদের স্বার্থে বিএসইসির কমিশন কমপ্লাইন্স অডিটরদের জন্য কোন মেয়াদের বাধ্যবাধকতা না রেখে কেয়ামত চুক্তি বা আজীবন অডিট করার সুযোগ রেখেছে?

অন্যদিকে পুঁজিবাজারের তালিকাভক্ত কোম্পানির ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের জন্য করা হয়েছে ৩৮/৪০ অডিটরের সমন্বয়ে অডিটরস প্যানেল কিন্তু কমপ্লাইন্স অডিটের জন্য কোন প্যানেল না করে সিএ/সিএমএ/সিএস তিন প্রোফেশনের জন্য উন্মক্ত রাখা হয়েছে। ফলে কমপ্লাইন্স অডিট হচ্ছে নামকাওয়াস্তে ১০/১৫/২০/২৫ হাজার টাকা নামমাত্র ফিতে। অথাৎ এখানেও কোন শৃঙ্খলা নেই কম ফিসের কারণে কমপ্লাইন্স অডিট হচ্ছে যেনতেন ভাবে শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার জন্য। এখানেও বিএসইসির বর্তমান কমিশনের দৃষ্টি দেয়া দরকার।

বিএসইসির একই কমিশন কর্তৃক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে অডিটের জন্য দ্বৈতনীতি পরিহার হওয়া দরকার। অর্থাৎ ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের জন্য যেমন সিএ প্রফেশন, অডিটরস প্যানেল এবং সর্বোচ্চ ৩ বছর একই অডিটর দ্বারা অডিটের বিধান করা হয়েছে, তেমনি কমপ্লাইন্স অডিটের ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র সিএস প্রফেশন, অডিটরস প্যানেল এবং সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত অডিটের বিধান করা আবশ্যক বলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিএসইসির দ্বৈতনীতির সুরাহা হওয়া জরুরি।

বিগত ১২ বছরের কমপ্লাইন্স অডিট পর্যালোচনায় দেখা গেছে ১% এর কম তালিকাভুক্ত কোম্পানি তাদের কমপ্লাইন্স অডিটর পরিবর্তন করেছে। অর্থাৎ যে সকল অডিট ফার্ম কোম্পানি সচিব বা সিএফও বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কথামত কোম্পানিকে ক্লিন রিপোর্ট দেয়নি। শুধু মাত্র সে সকল ক্ষেত্রেই সিজিসি অডিটর পরিবর্তন হয়েছে। আর অন্য সকল কোম্পানিতেই বিগত ১০/১২ বছর ধরে একই অডিটর সিজিসি সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছেন।

সুতরাং বিএসইসির বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর সবিনয় জিজ্ঞাসা; কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড ২০১৮ এর কন্ডিশন ৯ এর পরিবর্তন হবে কবে এবং অতিসত্বর পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের মত কমপ্লাইন্স অডিটরদের ক্ষেত্রেও ৩ বছরের জন্য নিয়োগের বিধি-বিধানের ব্যবস্থা করে দিবেন কিনা?

অতএব, চেয়ারম্যান সমীপে অনুরোধ পঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অডিটের দ্বৈতনীতি পরিহার করে কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড ২০১৮ এ সংশোধনী এনে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটে সিএ, কষ্ট অডিটে সিএমএ এবং কমপ্লাইন্স অডিটে সিএস প্রোফেশনকে পৃথকভাবে কাজের সুযোগ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন জোরদার করুন, যেন কর্মক্ষেত্রে পেশাদারদের কাজে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হয় এবং প্রোফেশনালরা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভুমিকা রাখতে পারেন।

লেখক: পুঁজিবাজার বিশ্লেষক, সম্পাদক-কর্পোরেট সংবাদ ডট কম ।

আরো খবর »

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক বোর্ড পুনর্গঠন

Polash

টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশের বাইরে কোহলি

সেরা উদ্যোক্তাকে পুরস্কার দিল প্রিমিয়ার ব্যাংক

Polash