সম্পাদকীয়

ভোজ্য তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সমাধান

দেশের বাজারে আরেক দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে সয়াবিন তেলের দাম। এই খাদ্যপণ্যটি এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রতিদিন রসনা বিলাসে তেল ছাড়া চলা অসম্ভব। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়েই দ্রব্যমূল্যের একটা ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। ধাপে ধাপে এর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অব্যাহত বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কে বলতে পারে। এদিকে ভোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। নাভিশ্বাস উঠলেও কিছুই করার নেই। বাজারে সয়াবিন তেলের কারসাজি নিয়েও অনেক খবর চোখে পড়ে। কয়েক মাস ধরেই এই পণ্যটিই রয়েছে আলোচনার শীর্ষে। তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বৃদ্ধি পায় এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য খাদ্যপণ্য। যখন থেকে তেলের মূল্য বাড়তে থাকে তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক পোস্টে কীভাবে তেল ছাড়া বা অতি অল্প তেল দিয়ে রান্না করতে হয় তা নিয়ে অজস্র পোস্ট চোখে পড়েছে। কিন্তু সত্যি কি এসব জীবনের খরচ একটু কমাতে পারে? কারণ এক দিকে খরচ বাড়লে অন্য দিকে টান পড়বেই। এই সমস্যার সমাধানে আপাতত সামনে যে পথগুলো রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো সয়াবিন তেলের বিকল্প তেলের উৎপাদন ও ব্যবহার এবং পরিবারে তেলের ব্যবহার কমানো। যদিও শেষের উপায়টি এরই মধ্যে অধিকাংশ পরিবারেই করা হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। এখন আর কমানোর উপায় আছে বলে মনে হয় না। তার চেয়ে বরং প্রথম উপায়টি কাজে লাগানো যেতে পারে। যেহেতু সয়াবিন তেলের জন্য আমরা বাইরের দেশের ওপর নির্ভরশীল। সেহেতু এর বিকল্প তেল ব্যবহার করা যায় তাহলে বিদেশ নির্ভরতার কমবে। অর্থাৎ আমদানি নির্ভরতা কমাতে সক্ষম হলেই সেই পণ্যের মূল্যও কমে আসার কথা। বাজারে যতক্ষণ পর্যাপ্ত বিকল্প পণ্য না আসে ততক্ষণ ভোক্তার চাপ সেই পণ্যেই থাকে। সেই তৈলবীজের উৎপাদন বাড়াতে হবে। তবে বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। সময়সাপেক্ষ হলেও এটা করতে পারলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকটে পড়তে হবে না। আমাদের দেশে উৎপাদিত সরিষা, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য তেলবীজ থেকে সোয়া দুই লাখ টন তেল পাওয়া যায় বলে এক তথ্যে দেখা গেছে। বাকিটা আমদানি করতে হয়। আর সেটাই সয়াবিন তেল।

একসময় গ্রামের অধিকাংশ মানুষই সরিষার তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। রান্নাবান্নাসহ প্রায় কাজেই সরিষার তেলের ব্যবহারই বেশি ছিল। অন্তত গ্রামে-গঞ্জে এই চিত্রই দেখা গেছে। ধীরে ধীরে সেই স্থান দখল করতে থাকে সয়াবিন তেল। আর তা ছাড়া সরিষার তেল ব্যবহারে ফিরলেও খরচের দিক থেকে কোনো লাভ নেই। এই তেলের দামও সয়াবিন তেলের চেয়ে বেশি। এখন আসা যাক সূর্যমুখী বীজ থেকে যে তেল উৎপাদিত হয় তার কথায়। আমাদের দেশে বিভিন্ন জেলায় সূর্যমুখীর চাষ হয়। তবে তা যে খুব বেশি তা নয়। সূর্যমুখী তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারলে সয়াবিন তেলের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। এখন যদি সয়াবিন তেলের দাম আরো বৃদ্ধি পায় তখন তো ক্রেতার অবস্থা আরো বেশি খারাপ হবে। কারণ শুধু যে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে তা নয়। আবার দাম বৃদ্ধি পেলে তা যে সহসাই কমবে সে নিশ্চয়তাও নেই। ফলে তেলের সমস্যা সমাধানে বিকল্প খুঁজতে হবে। সূর্যমুখীর তেল রান্নার জন্য অন্য তেল থেকে ভালো এবং বেশ স্বাস্থ্যকরও। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ভোজ্য তেলের মধ্যে সূর্যমুখীর গুণগতমান সবচেয়ে ভালো। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উপকূল অঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষে সফলতা এসেছে। সারা বিশে^ই সূর্যমুখী তেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এজন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করা হয়। আমাদের দেশেও বিভিন্ন জেলায় এই ফুলের চাষে চাহিদা বাড়ছে।

জানা যায়, বাংলাদেশে ৬০-৭০ দশকের দিকে সূর্যমুখী ফুলের চাষ শুরু হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। তা ছাড়া সয়াবিন তেলের দাম এভাবে বাড়তে থাকায় বাধ্য হয়েই বিকল্প ভোজ্য তেলের দিকে ঝুঁকতে চাইছে ক্রেতারা। কিন্তু সত্যি হলো এটি বাজারে পর্যাপ্ত নয় তবে সম্ভাবনা রয়েছে ব্যাপকভাবে। সূর্যমুখী ফুল দেখতে সুন্দর বিধায় অনেকেই বাড়ির আঙিনায়ও রোপণ করেন। তবে আমাদের প্রয়োজন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ। তবে শুধু সূর্যমুখী ফুলের ওপরই জোর দিচ্ছি না বরং এর সঙ্গে সরিষার চাষের ওপরও জোর দিতে হবে। বাজারে একাধিক পর্যাপ্ত বিকল্প না আসলে পরিস্থিতি রাতারাতি বদলানোর সুযোগ কম।

বিশ্ববাজারে কিন্তু সয়াবিন তেলের পরেই রয়েছে সূর্যমুখী তেলের চাহিদা। রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে সূর্যমুখীর আবাদ হয় বেশি। বিশে^ সবচেয়ে বেশি সয়াবিন তেল আমদানি করে ভারত, তারপর আলজেরিয়া এবং বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ভেতর অন্যতম প্রধান উপকরণ হলো ভোজ্য তেল। করোনার ধাক্কা সামলে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টারত মানুষের কাছে এটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে যদিও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব রয়েছে তবে দফায় দফায় এই মূল্য বৃদ্ধি বাজারের সঙ্গে জনজীবন অস্থির করে তুলছে। আবার এর সঙ্গে সিন্ডিকেটের একটা প্রভাবের কথাও আলোচনায় রয়েছে। সিন্ডিকেট শব্দটি আমাদের দেশে পরিচিত শব্দ। বাজারে কৃত্রিম সংকটও নতুন কোনো ঘটনা নয়। আমাদের দেশে পাম ওয়েল মূলত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। এই দাম বৃদ্ধির কোথায় শেষ তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ভোজ্য তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এর প্রভাব বেশ জোরালোভাবেই পড়ছে। তবে হুট করেই বিকল্প তেলের সন্ধানে গিয়েও কোনো লাভ নেই। তবে পরিকল্পনা করে এগোতে পারলে অল্প সময়েই আমরা বিকল্প তেল বাজারে আনতে পারব। যেহেতু সূর্যমুখী চাষের একটি বিশাল সম্ভাবনা আমাদের দেশেই রয়েছে সেহেতু এই সুযোগ নেওয়া উচিত। তা ছাড়া সরিষার তেলের উৎপাদনও বৃদ্ধি করতে হবে। এরই মধ্যে রান্নাবান্নায় সরিষার তেলের ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো বিকল্প আপাতত নেই।

আমাদের দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয় বাইরে থেকে। ফলে ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণের জন্য আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এখানেই আমাদের কাজ করতে হবে। যতক্ষণ অতিমাত্রায় নির্ভরতা থাকবে ততক্ষণ পুরোটাই বিশ্ববাজারের হাতে থাকবে। মূল্যবৃদ্ধির খবরে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ভোজ্য তেলের দাম যতবার বৃদ্ধির খবর শুনেছে ততবার সেই চিন্তার ভাঁজ কপালে পড়েছে। কারণ আয় তো বাড়েনি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষগুলো কোথায় দাঁড়াবে? বাজার করতে গিয়েই তার দৈনিক আয়ের বেশির ভাগ অংশই খরচ হয়ে যাচ্ছে। তাহলে পরিবারের অন্য আবদার সে কীভাবে পূরণ করবে? নিত্যদিন যখন সকালে ওঠে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বিরস মুখে বাজারের দিকে রওনা হয় তখন জিনিসপত্রের দাম তাকে অস্থির করে তোলে। মানুষের জীবনযাপন তখনই সুন্দর হবে যখন ভোজ্য তেল, চাল, মাছ, মাংসসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে। ক্রয়ক্ষমতা থাকা কথাটির অর্থ হলো আমার পরিবারের জন্য যেটুকু দরকার তা কেনার সামর্থ্য বোঝানো। ভোজ্য তেলের লাগামহীন বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের অস্বস্তি বাড়ছে। যেভাবেই হোক ভোজ্য তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে অবশ্যই সয়াবিন তেলের বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। সেই বিকল্প অবশ্যই আমদানি নির্ভর নয় বরং নিজ দেশে উৎপাদিত হতে হবে। সেক্ষেত্রে সরিষা এবং সূর্যমুখীর চেয়ে আর ভালো কিছু নেই। কারণ এই দুটি এরই মধ্যে আমাদের দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। সরিষা তো সেই প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির রসনার তৃপ্তি জোগাচ্ছে। আর সূর্যমুখী যেমন প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে তেমনিভাবে কিছুটা হলেও তেলের চাহিদাও পূরণ করছে। সুতরাং এই বিকল্পের ওপর আমাদের গুরুত্বারোপ করা উচিত এবং ভোজ্য তেলের চাহিদাকে সয়াবিন তেলে সিমাবদ্ধ না রেখে বিকল্পে মনোনিবেশ করতে হবে। তাহলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

লেখক : অলোক আচার্য, শিক্ষক ও কলামিস্ট।

আরো খবর »

দেশের টাকা বিদেশে পাচার

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ উজ্জীবিত করে বাঙালিকে

৪ ধাপে তালিকাভুক্ত কোম্পানির এজিএম হওয়া প্রয়োজন

helal shazwal