31 C
Dhaka
মে ১২, ২০২১
Corporate Sangbad | Online Bangla NewsPaper BD
নির্বাচিত কলাম

কোম্পানি সেক্রেটারি নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন

মো: মিজানুর রহমান : ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টরের মত তালিকাভূক্ত কোম্পানিতে কোম্পানি সেক্রেটারি নিয়োগের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবী।

২০১৮ সালের ৩ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সংশোধিত কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড এর উপর নোটিফিকেশন প্রকাশ করেছে। এটি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টর নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের যোগ্যতা এবং অযোগ্যতা নির্ধারণে এমনভাবে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে করে কোনভাবেই সেখানে নির্ধারিত যোগ্যতার বাইরের কেউ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টর হিসেবে নিয়োগ না পান। কিন্তু কোম্পানি সেক্রেটারি ও সিএফও নিয়োগে কোন নির্ধারিত যোগ্যতার কথা বলা হয়নি। এ নিয়ে কর্পোরেট মহলে আছে অনেক জল্পনা কল্পনা। কেন তা করা হলো তাই নিয়ে আজকের এ লেখা।

বিএসইসি কর্তৃক এ ধরনের নির্দেশনা সর্বজন মহলে তথা কর্পোরেট এরিনায় খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তালিকাভূক্ত কোম্পানির ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টর নিয়োগে এ ধরনের বিধিবদ্ধ যোগ্যতা নির্ধারণ হওয়ায় পরিচালনা পর্ষদ তাঁদের কোন নিকট আত্মীয়কে নামে-বেনামে কোম্পানির পরিচালক করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যা একটি সাহসী ও প্রশংসিত পদক্ষেপ। বিএসইসি’র এই উদ্যোগ অবশ্যই সময়োপযোগী, অপরিহার্য সঠিক সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তালিকাভূক্ত কোম্পানিগুলো আসলে কারা চালায়, সঠিকভাবে বিধি-বিধান পরিপালন হয়েছে কিনা তা দেখেন, দূর্নীতি প্রতিরোধ করেন এবং সর্বোপরি সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দেন তা কি আমরা জানি? বিএসইসি এর নির্দেশনা মোতাবেত প্রথমত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও অত:পর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা বা সিএফও এবং তারপর কোম্পানি সেক্রেটারি ও হেড অব ইন্টারনাল অডিট। যদি তাই হয়, তাহলে নিয়োগের পূর্বে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের নিশ্চয়ই তাঁদের যোগ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া দরকার। এবং এক্ষেত্রে যোগ্যতার বিচারে নিশ্চয়ই ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টরদের চেয়ে কোম্পানির এই চার কর্মকর্তার (সিইও, সিএফও, সিএস এবং হেড অব ইন্টারনাল অডিট) নির্ধারিত যোগ্যতার প্রশ্নটা আগে আসা উচিৎ- এমনটিই মত কর্পোরেট এরিনার অধিকাংশ বিশেষজ্ঞদের। অথচ এই চার কর্মকর্তার নিয়োগ প্রশ্নে বিএসইসি’র কর্পোরেট গর্ভনেন্স কোড-এ কোন যোগ্যতার মানদন্ড ও দিক নির্দেশনা নেই। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টরদের নির্ধারিত যোগ্যতা দরকার, খুবই ভাল কথা। কিন্তু যারা খাবার রান্না করবে, পরিবেশন করবে, ভালমন্দ ফলাফলের জন্য জবাবদিহিতা করবে তাদের নির্ধারিত কোন যোগ্যতার প্রয়োজন নেই কেন? যে কেউ হতে পারবেন কোম্পানির সিইও, সিএফও, সিএস এবং হেড অব ইন্টারনাল অডিট, তাদের কী কোন যোগ্যতা নির্ধারনের দরকার নেই? তাহলে ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স এবং লিজিং কোম্পানিতে নির্ধারিত যোগ্যতা ছাড়া কেউ চাইলেই কেন সিইও হতে পারেন না? বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা কী শুধু ব্যাংক, লিজিং ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতেই প্রয়োজন? ব্যাংক, ইন্সুরেন্স ও লিজিং কোম্পানি শুধু পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে না, পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত সকল কোম্পানিই অন্যের টাকায় ব্যবসা করে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের টাকায় পুঁজিবাজারের তালিকাভূক্ত সকল কোম্পানি ব্যবসা করে। তাহলে কিছু কোম্পানিতে কর্তাব্যক্তিদের যোগ্যতা নির্ধারিত থাকবে আবার অন্য সকল কোম্পানিতে কর্তাব্যক্তিদের নির্ধারিত যোগ্যতার কোন প্রয়োজন নেই কেন? কার স্বার্থে, কাদের পদ পদবি ঠিক রাখার জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক কতৃপক্ষ (বিএসইসি) তালিকাভূক্ত কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ চারজন কর্মকর্তার পূর্ব নির্ধারিত যোগ্যতা ছাড়াই নিয়োগের সুযোগ রেখেছে, বিষয়টি কি প্রশ্নবিদ্ধ নয়? পূর্বে কমিশন না করেছে তাই বলে কি বর্তমান কমিশনের কিছুই করার নেই?

মজার ব্যাপার হল, বিএসইসি তাদের প্রণীত কর্পোরেট গর্ভনেন্স কোড এ প্রত্যেক তালিকাভূক্ত কোম্পানিতেই আলাদা আলাদা এ সকল কর্মকর্তা নিয়োগে আবার বাধ্যবাধকতা রেখেছে। অর্থাৎ প্রতিটি তালিকাভূক্ত কোম্পানিতে বাধ্যতামূলকভাবে এই চার কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে হবে। যাদের গুরুত্ব এতই বেশি যে প্রতিটি কোম্পানিতে নিয়োগ দিতে হবে এই চার কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পূর্বে তাদের স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক, আবার প্রতিটি বোর্ডমিটিং এ তাদের উপস্থিত থাকতে হবে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার জন্য। একটি কোম্পানিতে এত গুরুত্বপূর্ণ চারজন কর্মকর্তা যাদের সহযোগীতা ছাড়া কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এক ধাপও সামনে এগোতে পারে না তাদের নির্ধারিত কোন যোগ্যতার নির্দেশনা কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-এ না থাকাটা খুবই হতাশাজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। ফলে বর্তমান কমিশন চাইলেই একটা সংশোধনী দিয়ে এ সকল পদের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতার বিধান দিতে পারেন।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টরের সার্টিফিকেশন তো কোথাও বাধ্যতামূলক করা হয়নি? ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টর নিয়োগে যদি নির্ধারিত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা যায় তাহলে কোম্পানিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টরের চেয়েও যারা অধিক গুরুত্বপূর্ণ তাদের যোগ্যতা নির্ধারনের বিষয়ে বিএসইসি’র এত অনীহা কেন?

বিএসইসি যদি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা, কোম্পানি সেক্রেটারি এবং হেড অব ইন্টারনাল অডিট এই চার কর্মকর্তার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা আরোপ করে দেন, তাহলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন ঝুঁকি কমবে তেমনি বিনিয়োগ বাড়বে, পুঁজিবাজার সব সময় স্বাভাবিক আচরণ করবে, বিনিয়োগকারীরা থাকবে ঝুঁকিমুক্ত, পেশাদার লোকদের কর্মসংস্থান হবে এবং সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

অন্যদিকে এই চার কর্মকর্তার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতার কোন বিষয় না থাকায় অধিকাংশ তালিকাভূক্ত কোম্পানিতে চাচা-ভাতিজা, মামা-ভাগিনা, বাপ-বেটা ও নিকট আত্মীয়দেরকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে কোম্পানির সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোম্পানির এই চার কর্মকর্তার কেউবা সাধারণ গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতোকত্তোর পাশ। ফলে, কোম্পানির কর্তাব্যাক্তিরা কম খরচে কম যোগ্যতা সম্পন্ন বা অযোগ্য লোককে নিয়োগ করছেন কোম্পানির এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে। নির্ধারিত পদের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতার নির্দেশনা না থাকায় সকল ক্ষেত্রে অযোগ্য লোকদের কোম্পানিতে নিয়োগ দেয়ার সুযোগ থেকে যাচ্ছে বরাবরের মতই। অথচ পুঁজিবাজারের তালিকাভূক্ত সকল কোম্পানিতে প্রফেশনাল লোক দেয়ার মত যথেষ্ট সংখ্যক সদস্য প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রফেশনাল ইন্সটিটিউটে। এক্ষেত্রে আইসিএবি, আইসিএমএবি এবং আইসিএসবি তালিকাভূক্ত সকল কোম্পানিতে যথেষ্ট মানসম্মত প্রফেশনালদের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। যারা কর্মক্ষেত্রে দেশ ও জাতির জন্য বয়ে আনছে আত্মনির্ভরশীলতা, সফলতা ও পেশাদারিত্ব। কোম্পানিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সিইও, সিএফও এবং কোম্পানি সেক্রেটারি (সিএস) যদি পেশাদার কেউ হন তাহলে তাদের দ্বারাই প্রতিষ্ঠানের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, কারণ সিইও, সিএফও এবং কোম্পানি সেক্রেটারি নিবিড়ভাবে কোম্পানি‘র পরিচালনা পর্ষদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। একজন  কোম্পানি সেক্রেটারি (সিএস) তার পেশাদারিত্ব দিয়ে পর্ষদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে। আর সেই উপদেষ্টা যদি পেশাদার না হন তাহলে তিনি পরিচালনা পর্ষদের জন্য উপদেষ্টা হিসেবে কতটা সহায়ক হবেন?

প্রতিটি কোম্পানিতে সিইও, সিএফও, সিএস এবং হেড অব ইন্টারনাল অডিট নিয়োগ দেয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি কোম্পানিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টরদের মত যোগ্যতা সম্পন্ন প্রফেশনাল কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া। তাহলেই পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। বিএসইসি’র উদ্যোগ সফল হবে। যে উদ্দ্যেশ্যে কর্পোরেট গর্ভনেন্স কোড ইস্যু করা হয়েছে তা কার্যকর ও বাস্তবায়ন হবে। অন্যথায় নির্দেশনা জারি হবে কিন্তু কোন কোম্পানিতেই যোগ্য লোক নিয়োগ পাবে না। কাজে পেশাদারিত্ব থাকবে না। অতপর বছর শেষে কমপ্লাইন্স সার্টিফিকেট দেবেন বিএসইসির তালিকা থেকে বাদ পড়া সেই সকল তথাকথিত সিএ ফার্মসূমহ যাদেরকে বিএসইসি অনেক আগেই ফাইন্যান্সিয়াল অডিট করার জন্য তালিকাভূক্তির বাইরে রেখেছে। কাজেই, দিন শেষে রেজাল্ট ‘পুরানো বোতলে নতুন পানীয়’। বিএসইসির সকল উদ্যোগের রেজাল্ট সেই আগের মতই শূণ্য। পুঁজিবাজার সঠিক পথে পরিচালনার সকল উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে সেই পুরোনো দুর্বৃত্তদের হাতেই জিম্মি থেকে যাবে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক যেন বর্তমান সরকারের সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্বের গুরুত্ব বাস্তবায়ন হয়। সুতরাং, কোস্পানির অতি গুরুত্বপূর্ণ এই চার জন কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টরদের মত নির্ধারিত যোগ্যতা নির্ধারণ করে কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা একটি জোরালো দাবি।

অন্যদিকে, বিএসইসি যদি উল্লেখিত চারটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা নির্ধারণ না করে দেয়, তাহলে নতুন কোম্পানি আইনেও ঐ চারটি পদ সম্পর্কে কিছু বলা থাকবে না, পদের কোন সংজ্ঞা থাকবে না এবং ঐ পদের জন্য কোন নির্ধারিত যোগ্যতাও থাকবে না। ফলে কোম্পানি আইন হয়ে যাবে পেশাদার শূন্য। আইনের ফাঁক-ফোকরে সব কোম্পানিতেই নিয়োগ পেয়ে যাবেন অযোগ্য লোকেরা এবং বেকার থাকবেন অধিকাংশ পেশাদার হিসাববিদ ও চাটার্ড সেক্রেটারি। কাজেই প্রতিটি কোম্পানিতে পদ বাধ্যতামূলক করার চেয়ে যোগ্যতা সম্পন্ন লোকের পদ সৃষ্টি করা জরুরি এবং এই বিষয়টিতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (বিএসইসি) আশু হস্তক্ষেপ ও কর্পোরেট গর্ভনেন্স কোড সংশোধন হওয়া প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে আইসিএবি, আইসিএমএবি এবং আইসিএসবি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে বিএসইসি‘র সাথে রাউন্ড টেবিল বৈঠক, সেমিনার, কর্মশালা ও আলোচনার মাধ্যমে  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে এবং এটি বাস্তবায়ন হলে কোম্পানির গুরত্বপূর্ণ এসব পদে নির্ধারিত যোগ্যতা সম্পন্ন পেশাদার সদস্যেদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যেমনটি হয়েছে প্রতিবেশি দেশগুলোতে।


আরো খবর »

কালো টাকার মালিকদের মিডিয়ার কারণে সাংবাদিক পেশা কলঙ্কিত হচ্ছে !

উজ্জ্বল

আইসিএসবি সদস্যভূক্ত প্র্যাকটিসিং ফার্মেই হতে পারে ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্ক্রুটিনাইজারস প্যানেল

Tanvina

রিং শাইনে স্বতন্ত্র পরিচালকদের কেউ সিএ, সিএমএ ও সিএস প্রফেশনের নয়, কেন ?

Tanvina