Corporate Sangbad | Online Bangla NewsPaper BD
শেয়ার বাজার

অডিটর প্যানেল না থাকায় কমপ্লায়েন্স অডিটে জবাবদিহিতা নেই

নুরুজ্জামান তানিম, কর্পোরেট সংবাদ : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা আনয়ন এবং অডিটরদের (নিরীক্ষক) জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে ‘অডিটর প্যানেল’ গঠন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এতে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের গুনগত মান বৃদ্ধির পাশাপাশি জবাবদিহিতার আওতায় এসেছেন ফাইন্যান্সিয়াল অডিটররা। তবে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের মান বৃদ্ধি পেলেও কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড (সিজিসি) অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স অডিটের অবস্থা বেশ নাজুক। কমপ্লায়েন্স অডিটের জন্য পৃথক কোনো ‘অডিটর প্যানেল’ না থাকায় এখনও জবাবদিহিতা তৈরি হয়নি। ফলে অধিকাংশ অডিটরা কমপ্লায়েন্স অডিট করার ক্ষেত্রে সুযোগ নিচ্ছেন।

একাধিক কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে- কোম্পানিগুলোর মনোনীত অডিটররা বিভিন্ন অসঙ্গতি প্রসঙ্গে আপত্তি জানিয়েছেন, যা বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনায় ক্ষেত্রে সংগঠিত বিভিন্ন অসঙ্গতি গোপন রাখার ক্ষেত্রে আপোষ করছে না অডিটররা। বিএসইসি’র গঠিত ‘অডিটর প্যানেল’ এর কারণে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটররা জবাবদিহিতার আওতায় এসেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অপরদিকে কোম্পানিগুলোর ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটা উন্নত হলেও কমপ্লায়েন্স অডিট এখনও অনেক দুর্বল রয়ে গেছে। ‘অডিটর প্যানেল’ না থাকায় কমপ্লায়েন্স অডিটের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা তৈরি হয়নি। ফলে কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে একাধিক ভুল ও অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে। তবুও অডিটরের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি জানাতে দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টকে ‘নট সেটিসফ্যাক্টরি’ (অসন্তুষ্ট) সার্টিফিকেট (সনদ) দিতে দেখা যাচ্ছে না। বরং সকল অডিটরই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে সখ্যতা বজায় রাখতেই গদবাধা ‘সেটিসফ্যাক্টরি’ (সন্তুষ্ট) সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। এমনকি অসঙ্গতিপূর্ণ ওই কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে ‘হাইলি সেটিসফ্যাক্টরি’ (পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট) সার্টিফিকেট দিয়েছেন অনেক কমপ্লায়েন্স অডিটর।

শতাধিক কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য পেয়েছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘কর্পোরেট সংবাদ’

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গা তৈরি করার জন্য কমপ্লায়েন্স অডিট এবং তার সার্টিফিকেশনের জন্য একটি পৃথক ‘প্যানেল অব কমপ্লায়ান্স অডিটর’ থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে বিভিন্ন অসঙ্গতির তথ্য বিএসইসি’র নজরে এসেছে। কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কমপ্লায়েন্স অডিটরদের আরো জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে বিএসইসি।

এ বিষয়ে বিএসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, “পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অডিটরদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিএসইসি ‘অডিটর প্যানেল’ গঠন করেছে। একইভাবে কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড অনুযায়ী কমপ্লায়েন্স অডিটরদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বিএসইসি চাইলেই আরেকটি ‘অডিটর প্যানেল’ গঠন করতে পারে।”

জানা গেছে, বিএসইসি’র ‘অডিটর প্যানেল’ গঠনের আগে ফাইন্যান্সিয়াল অডিট করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল প্রফেশনাল সিএ ফার্মদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ফলে যেনতেন অডিট ফার্মও অডিটরাও ফাইন্যান্সিয়াল অডিট করার সুযোগ পেতেন। তবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ অডিটর দিয়ে ‘অডিটর প্যানেল’ গঠন হওয়ার পর থেকে ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের মান বেড়েছে।

সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল অডিট- এ অডিট আপত্তি পাওয়া উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরেশন, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, ইনটেক লিমিটেড, সোনালী আঁশ, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, ন্যাশনাল টিউবস, উসমানীয়া গ্লাস, জিলবাংলা সুগার মিল, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, শ্যামপুর সুগার মিল, ওয়াটা কেমিক্যালস ও এমজেএল বাংলাদেশ। আর এসব কোম্পানির ‘অডিট আপত্তি’ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

‘অডিট আপত্তি’ পাওয়া এসব কোম্পানিগুলোর মধ্যে কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি অসঙ্গতি পাওয়া গেছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে। কোম্পানিটি সিজিসি’র সেকশন- ১(৭)(এ), ১(৭)(বি), ৪(২), ৬ ও ৯(২) পরিপালন করেনি। বিএসইসি’র নির্দেশনা অনুযায়ী লঙ্ঘিত ওই সেকশনগুলো পরিপালন করা কোম্পানিটির জন্য বাধ্যতামূলক ছিল, যা কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে আপত্তি জানিয়েছেন অডিটর। এছাড়া সিজিসি যথাযথভাবে পরিপালনের ক্ষেত্রে কোম্পানিটির আরো বেশ কিছু ভুল ও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এসব অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিটির কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টকে ‘হাইলি সেটিসফ্যাক্টরি’ সার্টিফিকেট দিয়েছেন কমপ্লায়েন্স অডিটর।

সিসিজি অনুযায়ী, কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে অসঙ্গতির পরিপ্রেক্ষিতে আপত্তি জানানো হলে, সেখানে ‘সেটিসফ্যাক্টরি’ বা ‘হাইলি সেটিসফ্যাক্টরি’ সার্টিফিকেট দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং সেখানে দিতে হবে ‘নট সেটিসফ্যাক্টরি’।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কমপ্লায়েন্স অডিটর কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, ‘কোম্পানিটি সিজিসি’র যেসব সেকশন পরিপালন করেনি সে বিষয়গুলো অমীমাংসিত। অন্যসব দিক বিবেচনায় এনে কোম্পানিটির কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টকে ‘হাইলি সেটিসফ্যাক্টরি’ সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আরো সতর্কতার সঙ্গে এ বিষয়গুলো দেখভাল করা হবে।’

একইভাবে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরেশন কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে সিজিসি’র সেকশন- ১(৩)(বি)(২), ১(৩)(বি)(৫), ১(৩)(ডি), ১(৭)(এ), ১(৭)(বি), ৪(২) ও ৬ লঙ্ঘন করেছে। উসমানিয়া গ্লাস কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে সিজিসি’র সেকশন- ১(৭)(এ), ১(৭)(বি), ৪(২) ও ৬ লঙ্ঘন করেছে। ন্যাশনাল টিউবস কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে সিজিসি’র সেকশন- ১(৭)(এ) ও ১(৭)(বি) লঙ্ঘন করেছে।

এদিকে অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, ইনটেক লিমিটেড, সোনালী আঁশ, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার ও এমজেএল বাংলাদেশের কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে বেশ কিছু ভুল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সিজিসি’র শর্তগুলো রিপোর্ট ফরমে ‘পরিপালন হয়েছে’ বা ‘পরিপালন হয়নি’ বলে ‘টিক চিহ্ন’ দিয়ে উল্লেখ করার কথা ছিল। কিন্তু কোম্পানিগুলো তা যথাযথভাবে পরিপালন করেনি।

এছাড়া বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করর্পোরেশনের আওতাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জিলবাংলা সুগার মিল, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর ও শ্যামপুর সুগার মিলের নামমাত্র ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আর ওয়াটা কেমিক্যালস ও ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ওয়েবসাইট থাকলেও, সেখানে সর্বশেষ কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন ছিল না। যার কারণে এ ৫ কোম্পানির কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসি’র কমিশনার হেলাল উদ্দিন নিজামী কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমরা কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট পাচ্ছি। কমপ্লায়েন্স অডিটর প্যানেল যদি বাধ্যতামূলক করতে চাই তাহলে স্বতন্ত্র কাউকে দিয়ে করাতে হবে। যারা স্ট্যাটুটরি অডিট করেন তাদেরকে দিয়ে করাব না। এখন আমাদেরকে চাটার্ড সেক্রেটারিসহ অন্যান্য প্রফেশনালসরা একটি কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট দিচ্ছে। কমপ্লায়েন্স অডিট পরিপালনের ক্ষেত্রে যদি কোনো ধরণের সন্দেহ থাকে অথবা আমাদের পর্যবেক্ষণে কোনো সার্টিফিকেশন যথার্থ নয় বলে মনে হয়, সেক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স অডিটের জন্য পৃথক প্যানেল গঠনের বিষয়টি কমিশনে আলোচনা করব।’

একই বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) প্রেসিডেন্ট মুজাফফর আহম্মেদ কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের ফার্মের সংখ্যা খুবই কম। এটা করতে গেলে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে সেক্রেটারিয়াল স্ট্যান্ডার্ড ডেভেলপ অন্যতম। এখনও আমাদের সেক্রেটারিয়াল স্ট্যান্ডার্ড ততোটা ডেভেলপড হয়নি। এখনও স্ট্যান্ডার্ড ডেভোলপের কাজ চলছে। ওটা হলে তখন বিষয়টি নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৮ জুলাই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা সংক্রান্ত বিধির একটি শর্ত পরিবর্তন করে তালিকাভুক্ত সকল কোম্পানিকে নির্ধারিত অডিটর প্যানেলের মাধ্যমে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয় বিএসইসি। একইসঙ্গে প্যানেলের অডিটর ফার্মগুলোও একই কোম্পানির নিরীক্ষা কার্যক্রম টানা তিন বছরের বেশি করতে পারবে না বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়। আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত অনিয়ম ও দূর্নীতি অভিযোগ ওঠায় কমিশন অডিটর প্যানেল গঠনের ঘোষণা দেয়।

এছাড়া বিএসইসি তাদের সংশোধিত কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮ এর সেকশন ৯ অনুসারে কর্পোরেট গভর্নেন্স কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে সব প্র্যাকটিসিং প্রফেশনাল ফার্মের (সিএ, সিএমএ ও সিএস) জন্য সমান সুযোগ রেখেছে। এর আগে ২০১২ সালে প্রথম বিএসইসি কর্তৃক একইভাবে কমপ্লায়েন্স অডিট করার জন্য কোম্পানির বোর্ডকে নির্দেশনা দেয়। যার ধারাবাহিকতায় কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড, ২০১৮ প্রবর্তীত হয়েছে।

কর্পোরেট সংবাদ/এনটি/

আরো খবর »

দর পতনের শীর্ষে তাল্লু স্পিনিং

Arif Hasan

দর বৃদ্ধির শীর্ষে কেয়া কসমেটিক্স

Arif Hasan

ইবনে সিনার দ্বিতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

Tanvina