Corporate Sangbad
শেয়ারবাজার

পুঁজিবাজারে এআই নজরদারি ও নতুন বিনিয়োগ পণ্য আনছে বিএসইসি

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩৬ অপরাহ্ন ·

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে নতুন আর্থিক পণ্য চালু, টেকসই বন্ড কাঠামো তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বিএসইসির পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- ব্লু বন্ড, অরেঞ্জ বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ড ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) চালুর মাধ্যমে বিনিয়োগ পণ্যে বৈচিত্র্য আনা। পাশাপাশি ইটিএফ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন এবং টেকসই বন্ডের জন্য একটি কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড চালুর লক্ষ্যও রয়েছে কমিশনের।

এরই মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংককে তিন বছর মেয়াদি ১ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটি ইতোমধ্যে সেটি চালুও করেছে।

সম্প্রতি বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এক উপস্থাপনায় বিএসইসির কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক সিকিউরিটিজ কমিশনসমূহের সংস্থা (আইওএসসিও) নির্ধারিত তিনটি মূল প্রতিপাদ্য— বিনিয়োগকারীর সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল প্রতারণা এবং জালিয়াতি সম্পর্কে সতর্কতা সামনে রেখে কমিশনের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম তুলে ধরেন তিনি।

তানভীর হাবিব রহমান জানান, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন, কারসাজি এবং অন্যান্য অনিয়ম শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়বে।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজার ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে উঠছে। বিনিয়োগকারীরাও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে বাজারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়ম শনাক্ত করতে বিএসইসির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

এআইভিত্তিক ব্যবস্থা কমিশনের বিদ্যমান নজরদারি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে। এর মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেনের ধরন শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

বর্তমানে বিএসইসির ইনস্ট্যান্টওয়াচ নামের নজরদারি ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যা ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সর্বশেষ সংস্করণ ভার্সন-৪ সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে পরবর্তী অনুসন্ধান, তদন্ত কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সতর্কবার্তা তৈরি করে।

প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিএসইসির এই কমিশনার। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য, ডিপফেক এবং পরিচয় জালিয়াতির বিষয়ে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আইওএসসিওর বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের বার্তা উদ্ধৃত করে তানভীর বলেন, এআই দিয়ে তৈরি বিনিয়োগ সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য, তা যত বিশ্বাসযোগ্যই মনে হোক না কেন, সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করুন।

তিনি বলেন, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে এআইকে সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এটি যেন নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণের বিকল্প না হয়। বিনিয়োগের আগে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

প্রতারণার সাধারণ কৌশল হিসেবে বিএসইসি, ব্রোকারেজ হাউস বা পুঁজিবাজারের অন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। প্রতারকেরা অনেক সময় ফোনকল, খুদে বার্তা, হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকের মাধ্যমে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগের বিজ্ঞাপন বন্ধেও উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। এ ধরনের বিজ্ঞাপন দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক রয়েছে সংস্থাটির।

বিনিয়োগের আগে প্রতিটি প্রস্তাব যাচাই করা এবং তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তানভীর হাবিব রহমান। তিনি বলেন, নিশ্চিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর অনুরোধ, কোনো বিনিয়োগ প্রকল্প বিএসইসি অনুমোদিত বলে মিথ্যা দাবি, আসল প্রতিষ্ঠানের মতো দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইট বা অ্যাপ এবং ‘এখনই বিনিয়োগ করুন’ কিংবা ‘কাউকে জানাবেন না’—এ ধরনের নির্দেশ প্রতারণার বড় লক্ষণ।

অনলাইন বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম প্রসপেরিয়া সিকিউরিটিজ গ্রুপ লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিএসইসির দেওয়া জনসতর্কতার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তার বার্তা, ‘থামুন, যাচাই করুন, তারপর বিনিয়োগ করুন।’ সন্দেহজনক প্রতারণার ঘটনা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পাশাপাশি অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য ও আর্থিক তথ্য অন্যের সঙ্গে বিনিময় না করার পরামর্শ দেন তিনি। ফিশিং, পরিচয় জালিয়াতি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা বিনিয়োগ প্রতারণা থেকেও সতর্ক থাকতে বলেন।

বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বাজারের ওঠানামা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি। তানভীর হাবিব রহমান বলেন, ‘স্থিতিস্থাপকতার জন্য শুধু আর্থিক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আচরণগত শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্থির থাকার সক্ষমতা।’

বিএসইসির উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০২৬ সালের ৮ জুন শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয় এবং ১ জুলাই সার্কিট ব্রেকারের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে দৈনিক দর ওঠানামা এখন বাজারে শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।

বিনিয়োগকারীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য জরুরি সঞ্চয় রাখা, আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলা, নিয়মিত বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পর্যালোচনা ও পুনর্বিন্যাস এবং যোগ্য ও নিবন্ধিত পেশাজীবীদের পরামর্শ নেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত আর্থিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

গত ২ জুন নিয়োগ পাওয়া বিএসইসির নতুন কমিশন পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জও (ডিএসই) উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলের ৭২ কোটি টাকা ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীর মধ্যে বিতরণ শুরু করেছে সংস্থাটি।

বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমিশন ২২৭টি আইন প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ৪১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এ সময়ে ১২৮টি তদন্ত ও ১৯২টি পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১০০টি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করা হচ্ছে।

বাজার কারসাজি, অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে অনৈতিক লেনদেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তানভীর হাবিব রহমান। একই সঙ্গে ক্যাপিটাল মার্কেট ট্রাইব্যুনালকে শক্তিশালী করা এবং অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষায় বিধিমালা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতের কার্যক্রম এড়িয়ে সরাসরি মামলা দায়েরের সুযোগ তৈরির উদ্যোগও রয়েছে। অন্যদিকে, ক্যাপিটাল মার্কেট কমপ্লেইন্ট অ্যান্ড আরবিট্রেশন ম্যানেজমেন্ট (সিসিএএম) ব্যবস্থায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৩৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ৫২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সহজ করতে বিদ্যমান বিধিবিধানেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। এতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব একত্রে দেওয়ার বিষয়েও বিধান অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট মার্জিন বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে।

বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ সহজ করতে অনবোর্ডিং পোর্টাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বিএসইসির। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএসইতে বিদেশি লেনদেন ২৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ১৫২ শতাংশ বেড়েছে।

বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করতে অনলাইনে বিও হিসাব খোলা, ডিএসইর মোবাইল ট্রেডিং, আইপিও আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের দ্রুত তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরিতে ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে সচেতন বিনিয়োগকারী গড়ে তুলতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পুঁজিবাজার বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে বিএসইসি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) ও বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটস (বিএএসএম)-এর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ২৬ হাজার ৩৯২ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তানভীর হাবিব রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের জ্ঞান বাড়ানো, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা বাড়ানো— এসব উদ্যোগ একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, ‘আসুন, সবাই মিলে পুঁজিবাজারের জন্য একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগকারী সমাজ গড়ে তুলি।’
সূত্র-বাসস।