কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। অগ্নিকাণ্ডে ইট ও কাঠ দিয়ে তৈরি তিনতলা রিসোর্টটির প্রায় পুরো স্থাপনা পুড়ে গেছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রেসটো অ্যান্ড রিসোর্টে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত ১০ জনের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিরা হলেন- ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), নাফিজের বড় বোন ফারিয়া কবির (৩৩), তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নে ফায়িজান আহম্মেদ, ঢাকার সাভারের ‘স্বপ্ন বিলাস স্কুল’ নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামী। বাকি দু’জনের নাম এখনো জানা যায়নি। নিহত ১০ জনের পোড়া মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে আহতরা হলেন- মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন সাদী (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হবে।
কক্সবাজারে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারে কর্মরত সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ।
তিনি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে স্থানীয়ভাবে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এভাবে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের রান্নাঘরের দিক থেকে বিকট শব্দ হওয়ার পর আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্থাপনায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় উদ্ধার অভিযানও পরিচালনা করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, টুপটুপ রিসোর্টে মোট কক্ষ ছিল ৯টি। গত শুক্রবার রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকেরা চেকআউট করে চলে যান। এরপর বাকি ছয়টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জন শনিবার সকালে বিভিন্ন কাজে রিসোর্টের বাইরে ছিলেন। অন্যদিকে, আগুন লাগার সময় রিসোর্টের ভেতরে থাকা পর্যটকদের অনেকে ঘুমিয়ে থাকায় তারা কক্ষের মধ্যে আটকা পড়েন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। চলতি বছরের জুন মাসে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। রিসোর্টটির নিচতলায় রান্নাঘর এবং ওপরের তলাগুলোতে আবাসিক ব্যবস্থা ছিল। রান্নাঘর থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। এ মামলায় রিসোর্টটির মালিক তানভীর আহমদ ও ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আসামি করা হয়েছে। এরইমধ্যে ম্যানেজার সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।
এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।