Corporate Sangbad
নির্বাচিত কলাম

বিদেশমুখী চিকিৎসা নয়, সচেতন সিদ্ধান্তই হোক অগ্রাধিকার

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ন · মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন

একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তাঁর এবং পরিবারের প্রথম প্রত্যাশা থাকে—সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া। প্রিয়জনের সুস্থতা নিশ্চিত করতে অনেক পরিবার দেশের পাশাপাশি বিদেশের চিকিৎসাসেবার কথাও বিবেচনা করেন। উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশা, পরিচিতজনের অভিজ্ঞতা কিংবা সামাজিক ধারণা অনেক সময় তাঁদের এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তবে চিকিৎসার গন্তব্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত রোগীর শারীরিক অবস্থা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা। কারণ চিকিৎসার সঠিক সিদ্ধান্ত শুধু কোথায় চিকিৎসা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করে না; এটি রোগীর সুস্থতা, পরিবারের মানসিক স্বস্তি এবং সামগ্রিক চিকিৎসাযাত্রাকেও প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, আধুনিক রোগনির্ণয় প্রযুক্তি, উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতি এবং বিশেষায়িত সেবার সুযোগ দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে অনেক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা ও পরবর্তী পরিচর্যার জন্য দেশের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই অগ্রগতি দেশের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিবেচনায় নেওয়ার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

তবে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া বা দেশে চিকিৎসা গ্রহণ—কোনটি উপযুক্ত, সেই সিদ্ধান্ত সবার জন্য এক রকম হতে পারে না। রোগের ধরন, জটিলতা, চিকিৎসার পর্যায়, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসুবিধার ওপর সিদ্ধান্তটি নির্ভর করে। কিছু জটিল বা বিরল রোগের ক্ষেত্রে বিদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেশের উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধার মাধ্যমে কার্যকর চিকিৎসা গ্রহণ সম্ভব। তাই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের চিকিৎসাসেবার সুযোগ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া একটি বিচক্ষণ পদক্ষেপ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চিকিৎসার মান বিচার করতে শুধু হাসপাতালের অবস্থান বা দেশের নামকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। বরং রোগীর নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের দক্ষতা, রোগনির্ণয়ের যথার্থতা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সুবিধার প্রাপ্যতা, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যার বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি সঠিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত চিকিৎসাগত তথ্য ও পেশাদার পরামর্শ, প্রচলিত ধারণা কিংবা অন্য কারও অভিজ্ঞতা নয়।

এ ক্ষেত্রে ‘সেকেন্ড ওপিনিয়ন’ বা দ্বিতীয় চিকিৎসা-পরামর্শ রোগী ও তাঁর পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বড় অস্ত্রোপচার, জটিল রোগের চিকিৎসা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অন্য একজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া রোগীকে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে। রোগনির্ণয়, চিকিৎসার বিকল্প, সম্ভাব্য ঝুঁকি, প্রত্যাশিত ফলাফল এবং আনুমানিক ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার মাধ্যমে পরিবার আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। প্রয়োজনে দেশের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাও যাচাই করা যেতে পারে।

চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত, আবাসন, ভিসা, রোগীর সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের খরচ এবং দীর্ঘ সময় অবস্থানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হয়। অন্যদিকে, দেশে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ থাকলে অনেক পরিবারের জন্য চিকিৎসা ও ফলোআপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হতে পারে। তবে ব্যয় কখনোই চিকিৎসার উপযুক্ততা নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়। রোগীর নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার প্রাপ্যতা এবং চিকিৎসাগত ফলাফলকে অগ্রাধিকার দিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা তৈরির অন্যতম ভিত্তি হলো রোগীকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা। একজন রোগীর কাছে চিকিৎসার মান শুধু রোগনির্ণয় বা চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণ, প্রয়োজনীয় তথ্যের সহজলভ্যতা, সময়মতো সেবা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, রোগীর গোপনীয়তা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ। রোগী যখন তাঁর চিকিৎসা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান, প্রশ্ন করার সুযোগ পান এবং সম্মান ও সহমর্মিতার সঙ্গে সেবা গ্রহণ করেন, তখন তাঁর আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়। তাই দেশের স্বাস্থ্যসেবার অগ্রযাত্রায় চিকিৎসার মানোন্নয়নের পাশাপাশি রোগীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে রোগীর চিকিৎসাযাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই শুরু হয় অনলাইনে তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে। রোগী ও তাঁর পরিবার হাসপাতাল, চিকিৎসক, চিকিৎসাসেবা, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং অ্যাপয়েন্টমেন্টের তথ্য জানতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করছেন। এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল মাধ্যমে নির্ভুল, সহজবোধ্য এবং হালনাগাদ তথ্য সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত সেবা, অ্যাপয়েন্টমেন্টের পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য রোগীকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ডিজিটাল যোগাযোগের লক্ষ্য শুধু সেবার প্রচার নয়; বরং রোগীকে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত করা।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা আরও বাড়াতে হাসপাতাল, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক দিকনির্দেশনা, পেশাগত মান বজায় রাখা এবং সেবার প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই আস্থা গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসার ফলাফল, রোগীর অভিজ্ঞতা এবং সেবার মানোন্নয়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের আস্থা অর্জনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা যত বিস্তৃত হবে, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণও তত বেশি তথ্যনির্ভর হবে। রোগী ও পরিবারের সামনে যখন নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকবে, তখন তাঁরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের উপযুক্ত চিকিৎসাসেবার সুযোগ বিবেচনা করতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্ত এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে যেখানে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন, সেখানেও যথাযথ পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদেশে চিকিৎসা নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা নয়; বরং প্রতিটি রোগীকে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসার পথ বেছে নিতে সহায়তা করা।

স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ শুধু আধুনিক প্রযুক্তি বা উন্নত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে রোগীর আস্থা, তথ্যের স্বচ্ছতা, পেশাগত দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ। চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়ে রোগীর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, চিকিৎসার বিকল্পগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হবে। দেশের চিকিৎসাসেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর জন্য এসব বিষয়কে ধারাবাহিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে, চিকিৎসার গন্তব্য নির্ধারণের আগে সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া যেমন কিছু পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় হতে পারে, তেমনি দেশের উপযুক্ত চিকিৎসাসেবার সুযোগগুলো সম্পর্কে জানা ও সেগুলো বিবেচনা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর প্রয়োজন, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই চিকিৎসার ক্ষেত্রে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস বাড়বে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবার ধারাবাহিক উন্নয়নের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে আরও আস্থাশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ।

বিদেশমুখী চিকিৎসা নয়, অগ্রাধিকার হোক সঠিক চিকিৎসা নির্বাচন। সিদ্ধান্তের ভিত্তি হোক নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং রোগীর সুস্থতা।

লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন, হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম।