পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়া, চুরি হওয়া বা নষ্ট হওয়ার ঘটনায় নতুন এবং কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে সরকার।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের বহির্গমন-৭ শাখা থেকে এই সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র জারি করা হয়। উপসচিব মোহাম্মদ নুরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রে পাসপোর্টের অপব্যবহার রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমবার পাসপোর্ট হারালে বা নষ্ট হলে কেবল নির্ধারিত ফি দিতে হবে, কোনো অতিরিক্ত দণ্ড ফি লাগবে না। তবে দ্বিতীয়বার বা তার বেশি প্রতিবার পাসপোর্ট হারালে, চুরি বা বিনষ্ট হলে নির্ধারিত নিয়মিত ফির অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দণ্ড ফি পরিশোধ করতে হবে।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি পাসপোর্ট হারানো, চুরি বা বিনষ্ট হওয়ার মিথ্যা বা বাস্তব ঘোষণা দিয়ে পুনরায় পাসপোর্ট বা পুনঃইস্যুর জন্য আবেদন করছেন। যেহেতু পাসপোর্ট একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভ্রমণ দলিল, তাই এর সম্ভাব্য অপব্যবহারের মাধ্যমে মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের মতো গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করেই সরকার এই নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করেছে।
পাসপোর্ট হারালে বা নষ্ট হলে করণীয় প্রক্রিয়া
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, পাসপোর্ট হারালে বা নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে:
অনলাইন রিপোর্টিং: অনতিবিলম্বে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্ধারিত ওয়েবসাইট বা অনলাইন মাধ্যমে বিষয়টি রিপোর্ট করতে হবে।
থানায় জিডি: অবিলম্বে নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে।
জিডি যাচাই ও প্রতিবেদন: সংশ্লিষ্ট থানা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জিডির সঠিকতা যাচাই করে প্রতিবেদন বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর বা নিকটস্থ পাসপোর্ট অফিসে পাঠাবে। তবে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়া না গেলে, জিডির কপি যুক্ত করেই পাসপোর্টের পুনঃইস্যুর আবেদন করা যাবে। এর ভিত্তিতে অধিদপ্তর ‘Lost Circular’ জারি করে নতুন পাসপোর্ট দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।
ট্রাভেল এজেন্সি কর্তৃক পাসপোর্ট আটকা পড়লে করণীয়
জিডি যাচাইয়ের সময় যদি দেখা যায় যে, ভিসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ট্রাভেল এজেন্সির কাছে পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছিল এবং তা অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে—যা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব নয়—তবে সেই পুরনো পাসপোর্টটি ‘Revoke’ (বাতিল) করে নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এছাড়া, হারানো বা চুরি হওয়া পাসপোর্টের তথ্য পাওয়ার পর স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) তাদের ইমিগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (IMS) প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত হালনাগাদ করবে এবং প্রয়োজনে ইন্টারপোলকেও বিষয়টি অবহিত করা হবে।
প্রবাসীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
দেশের বাইরে অবস্থানকালে যদি কারও পাসপোর্ট হারায়, চুরি হয় বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে তাদের নির্ধারিত অনলাইন মাধ্যমে রিপোর্ট করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেটে অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মিশন ‘Lost Circular’ জারি করে পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে।
নতুন পাসপোর্টে যা থাকবে এবং অন্যান্য শর্তাবলী
বিশেষ নোট: হারানো, চুরি বা বিনষ্ট হওয়া পাসপোর্টের পরিবর্তে নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করা হলে তার ডেটাপেজে স্পষ্টভাবে ইংরেজিতে ‘Previous Passport is Reported to be Lost’ কথাটি লেখা থাকবে। পাশাপাশি ডাটাবেজে আগের পাসপোর্টের স্ট্যাটাস ‘Lost/Revoked’ হিসেবে আপডেট করা হবে।
মৌলিক তথ্য পরিবর্তন নিষেধ: পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর ক্ষেত্রে আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ, বাবা ও মায়ের নাম—এই মৌলিক পরিচয়গত তথ্যগুলো সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা যাবে না। তবে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুমোদিত সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধ তথ্য সংশোধনের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে।
আংশিক বা সম্পূর্ণ নষ্ট হলে: আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট পাসপোর্টের শনাক্তযোগ্য অংশ যদি আবেদনকারীর কাছে থাকে, তবে সেটি জমা দিয়ে নতুন পাসপোর্ট নেওয়া যাবে। তবে পাসপোর্ট সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেলে এবং আবেদনকারীকে শনাক্ত করার মতো কোনো অংশ না থাকলে, তা হারানো পাসপোর্টের নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়াকরণ করতে হবে।
পাসপোর্ট ফিরে পেলে করণীয়: হারানো বা চুরি গেছে মর্মে রিপোর্ট করার পর কোনো পাসপোর্ট যদি পরবর্তীতে পাওয়াও যায়, তবুও সেটি আর পুনরায় সক্রিয় বা বিদেশ ভ্রমণে ব্যবহার করা যাবে না। এমন ক্ষেত্রে পাসপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা থানাকে এবং অনলাইন মাধ্যমে জানাতে হবে (প্রবাসীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিশনকে জানাতে হবে)। কর্তৃপক্ষ তখন ডাটাবেজ ও ইমিগ্রেশন অ্যালার্ট পুনরায় হালনাগাদ করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই পরিপত্র জারির তারিখ থেকেই তা কার্যকর হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব আগের আদেশ ও নির্দেশনাগুলোকে সমন্বয় ও সংশোধন করে এই যুগপৎ ও আধুনিক নীতিমালা কার্যকর করা হলো।