Corporate Sangbad
অর্থ-বাণিজ্য

২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ কোটি ডলারের বাজারের হাতছানি

প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৯ অপরাহ্ন ·

বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বাজারে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের সরঞ্জাম ও উপকরণের চাহিদা তৈরি হতে পারে। গৃহস্থালি পর্যায়ে এ প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটলে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন সম্ভব, যা দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত মেটাতে পারে বলে জানিয়েছে ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জি প্ল্যাটফর্ম (ডিআরইপি)।

আবাসিক খাতই এ সম্ভাবনার মূল চালিকাশক্তি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৯৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা (টিডব্লিউএইচ) বিদ্যুৎ এ খাতে ব্যবহৃত হয়েছে। দেশের মোট ৪ কোটি ৩ লাখ পরিবারের মধ্যে ৩ কোটি ৫৬ লাখ বা ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করে।

সীমিত হারে সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণের একটি পরিস্থিতি বিবেচনায়, যেখানে ১০ শতাংশ পরিবার ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট-পিক (কেডব্লিউপি) ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবে, সেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট-পিক (এমডব্লিউপি) উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন সম্ভব। এর মাধ্যমে বছরে ১৩ হাজার ৯৩৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা (জিডব্লিউএইচ) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, যা বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণ করতে পারে বলে জানিয়েছে পাঁচটি বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ডিআরইপি।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদী বলেন, মাঝারি মাত্রায় এ প্রযুক্তির প্রসার ঘটলে মোট ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। এতে বছরে ৩৪ হাজার ৫১৮ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, যা জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম।

তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রতি এক মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা প্রতিবছর জাতীয় কোষাগারের ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা সাশ্রয় করতে পারে। এর ফলে আমদানিনির্ভর ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি প্রতি মেগাওয়াটে ৮ হাজার ১০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণও কমানো সম্ভব হবে। বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি ব্যয় হয়।

হাসান মেহেদী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিশাল বাজার ১০ ধরনের হার্ডওয়্যার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের চাহিদা তৈরি করে উল্লেখযোগ্য শিল্প কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সৌর পিভি প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা। পাশাপাশি স্থাপনকারী থেকে প্রশিক্ষক ও উদ্যোক্তা পর্যন্ত পাঁচটি প্রধান পেশাগত ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত স্থাপন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা গেলে সরঞ্জাম ও উপকরণের বাজারমূল্য আনুমানিক ১ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এর মধ্যে সৌর প্যানেলের বাজারমূল্য ৬২৮ মিলিয়ন ডলার এবং ইনভার্টারের ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার।

এ খাতের সম্প্রসারণে বিপুল কর্মসংস্থানেরও সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুতের প্রতি ১ কিলোওয়াট সক্ষমতায় গড়ে ২ দশমিক ৫২টি সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এমনকি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা ৫০ শতাংশ ধরা হলেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে প্রায় ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

বাজারের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে এ খাতে সক্ষমতা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সিপিডির গবেষণা সহযোগী মো. মেহেদী হাসান শামীম বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে নেট মিটারিংয়ের আওতায় ৪ হাজার ৫৫১টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ স্থাপনাই ঢাকা বিভাগে।

তিনি বলেন, সরকার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রে (আরইএসপি) ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট করেছে।

তবে ভোক্তা ও শিল্প উভয় পর্যায়েই উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ক্লিনের এক জরিপ অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে জনসচেতনতার হার ৮৭ শতাংশ হলেও মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ মনে করেন সৌরবিদ্যুৎ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। অন্যদিকে, ২৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন সৌর প্যানেলের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নেই।

অ্যাকশনএইডের ব্যবস্থাপক আবুল আজাদ বলেন, সরঞ্জাম কেনার জন্য উচ্চ প্রাথমিক ব্যয়, পরিবারের অনিয়মিত আয় এবং সহজলভ্য ঋণ সুবিধা সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা এ প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে বাধা সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক পর্যায়েও নানা জটিলতা রয়েছে। জটিল ঋণপ্রক্রিয়া, আমদানিকৃত উপকরণের ওপর উচ্চ হারে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার পরিদর্শন ও জাতীয় গ্রিডে সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সিপিডি আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিংয়ের যোগ্যতার শর্ত সহজ করার পাশাপাশি অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল আবেদন প্ল্যাটফর্ম চালুর সুপারিশ করেছে।

এ ছাড়া সংস্থাটি বিশেষ ঋণ সুবিধা, আংশিক ঋণ নিশ্চয়তা এবং ‘পে-অ্যাজ-ইউ-সেভ’ বা সাশ্রয়ের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের মতো অর্থায়ন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে।

সিপিডি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং সোলশেয়ার মূলধনি ব্যয় কমাতে পিভি প্যানেল ও লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামকে শূন্য শুল্কের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে।

তারা কম উৎপাদনশীল বা অকার্যকর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চিহ্নিত, মূল্যায়ন ও পুনরুদ্ধারের জন্য একটি জাতীয় পুনর্বাসন কর্মসূচি চালুরও সুপারিশ করেছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।

সুপারিশগুলোর মধ্যে ছোট আকারের বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য আমদানিকৃত আনুষঙ্গিক সরঞ্জামে সম্পূর্ণ শুল্ক অব্যাহতি এবং পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমগুলোকে হাইব্রিড ও গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করে পুনরায় কার্যকর করার বিষয়ও রয়েছে। এর ফলে এসব সম্পদ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে না।