অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের ৯ম পে-স্কেল প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যা চলতি বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকাল ৫টায় সচিবালয়ে নতুন এক নম্বর ভবনের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এদিন বিকেল ৫টায় বৈঠকটি শুরু হয়।
বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘বেতন ও চাকরি কমিশন, ২০২৬’ এবং এ-সংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশের আলোকে নতুন বেতন স্কেল ও ভাতাদি নির্ধারণের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। পরে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকেই নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে, কিন্তু তা ভেঙে ভেঙে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। প্রজ্ঞাপন জারি করতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
সর্বশেষ ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী, সর্বোচ্চ বেতন (গ্রেড-১) ছিল ৭৮ হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন (গ্রেড-২০) ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন বেতন কাঠামোতে তা গড়ে ১০০ শতাংশেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী, গ্রেড-১ এর জন্য ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০তম গ্রেডের জন্য নির্ধারিত বেতন ২০ হাজার টাকা। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪২ ও সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ বেতন বাড়বে। এছাড়াও ৯ম পে-স্কেল অনুযায়ী প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু হতে যাচ্ছে। যার আওতায় মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হবে।
জানা গেছে, সবকিছু ঠিক থাকলে অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন। তবে নতুন কাঠামো কার্যকর ধরা হবে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর-এই তিন মাসের বেতন পুনর্নির্ধারণ করে বকেয়া অর্থ পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ গেজেট প্রকাশে দেরি হলেও বেতন বৃদ্ধির কার্যকর তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছে না।
মন্ত্রিসভার পর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং পে-স্কেলের মূল বিষয়গুলো এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদিত হওয়ার পর প্রস্তাবটি প্রয়োজনীয় যাচাই ও পর্যালোচনার (ভেটিং) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই প্রজ্ঞাপন জারির চূড়ান্ত পথ উন্মুক্ত হবে।
দেশের সার্বিক আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও বাস্তবায়নের কৌশল বিবেচনা করে সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ, কমিশনের মূল সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বৃদ্ধির হার কিছুটা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের মূল বেতন ও ভাতাগুলো চার ধাপে বাস্তবায়িত হবে।
প্রথম ধাপ : চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ : আগামী বছরের জানুয়ারি (বছরের শুরু) থেকে আরও ৩৫ শতাংশ কার্যকর করা হবে।
তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপ : মূল বেতনের অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে ও এরপর ওই একই অর্থবছরের জানুয়ারিতে ভাতাগুলো বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।

অনুমোদিত জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এ সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুননির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতনস্কেলে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যায্যতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকার এক গ্রেড এক পেনশন বা ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ (ওআরওপি) পদ্ধতি প্রবর্তনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ পদ্ধতি সামরিক ও অসামরিক—সব ক্ষেত্রে একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
তবে এ মুহূর্তে ওআরওপি পদ্ধতি বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ থাকায় এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের কোনো তথ্য না থাকায় সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ওআরওপি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সে আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তা ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বাড়বে।
এর ফলে যেসব পেনশনভোগী দীর্ঘদিন আগে অবসরে গেছেন এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাচ্ছেন, তাঁদের নিট পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে।
সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এত দিন শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য ছিল। জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ সব কর্মচারীর জন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বেতনস্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় সরকার পুরো বেতনস্কেল একযোগে বাস্তবায়ন না করে চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এর আওতায় ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে ধাপে ধাপে নিট পেনশন বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনস্কেল অনুমোদন করা হবে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এর মতো একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
সরকার মনে করছে, এভাবে পর্যায়ক্রমে নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমিত করা সম্ভব হবে।
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এ অর্থের সংস্থান মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো (মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হয়েছে।
সরকার মনে করে, নতুন বেতনস্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। সেখানে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান থাকবে।
অনুমোদিত বেতনস্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।