Corporate Sangbad
জাতীয়

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৬ অপরাহ্ন ·

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে পরাজিত করে বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে মির্জা ফখরুলকে বিজয়ী ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

সিইসি বলেন, বৈধ ব্যালট পেপারের মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ পেয়েছেন ৮৮টি ভোট। এছাড়া বিএনপি মনোনীত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫টি ভোট পেয়েছেন। সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পেয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাঁড়িয়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে একটি লাল গোলাপ তুলে দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। এর পরপরই বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এগিয়ে এসে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তার সঙ্গে কোলাকুলি করেন। পরে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরাও একে একে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে তার সঙ্গে আলিঙ্গন করেন।

May be an image of one or more people

এর আগে দুপুর ২টা থেকে সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এরপর প্রথমেই ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম), প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। পরে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একে একে সংসদ সদস্যরা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

এদিকে অধিকাংশ সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেও ছয়জন দেননি। তাদের মধ্যে ৫ জন জাতীয় সংসদে উপস্থিত হননি। তারা হলেন-বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের ড. ওসমান ফারুক ও চট্টগ্রাম-৩ আসনের মোস্তফা কামাল পাশা।

এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ দলীয় সিদ্ধান্তে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির মহাসচিব, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আজই তার শেষ দিন। আগামীকাল সন্ধ্যায় ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন তিনি। এর পর থেকেই সংসদে রাষ্ট্রপতির জন্য বরাদ্দকৃত আসন বা গ্যালারিতে বসবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মির্জা ফখরুলকে বলা হয় বিএনপির আলোকবর্তিকা। দলের চেয়ারপারসনের দীর্ঘ কারাভোগ-অসুস্থতা এবং ভাইস চেয়ারম্যানের প্রবাস জীবনের কঠিন সময়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (অধুনা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) একজন সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (শিক্ষা ক্যাডারের) প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে একজন সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যান্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে, সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন, ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে আবার শিক্ষকতা পেশায় ফেরেন।

১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একইসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের মধ্যদিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ৫ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। সে থেকে আজ পর্যন্ত মহাসচিব হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি।

মির্জা ফখরুল ১৯৯১ সালে পঞ্চম ও ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচন করলেও দুটিতেই পরাজিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নির্বাচন করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরের নভেম্বরে বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় প্রথমে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

মির্জা ফখরুল ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হন। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন। বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তীকালে শপথ গ্রহণ না করায় নির্বাচন কমিশন তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে এবং সেখানে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন এবং নবগঠিত সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) বঙ্গভবনে সন্ধ্যায় দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নতুন নির্বাচিত দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করাবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।