Corporate Sangbad
জাতীয়

ঢাকাসহ তিন জেলায় নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সেবা চালু

প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ২:১৯ অপরাহ্ন · নিজস্ব প্রতিবেদক

কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ তিন জেলায় বিশেষ ‘পিংক বাস’ সেবা চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। গোলাপি রঙের এ বাসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নারীরা।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোতে এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবার উদ্বোধন করেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম জানান, নারীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই সেবার পরিধি ভবিষ্যতে আরও বাড়ানো হবে। পর্যায়ক্রমে নতুন রুটে বাস চালুর পাশাপাশি বাসের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হবে। বর্তমানে নারীরা যে পরিবেশে যাতায়াত করছেন, সেটিও ধীরে ধীরে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

মন্ত্রী কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, নারী যাত্রীরা যেন এই বাসে চড়তে ও যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বাস চালু করলেই হবে না, পুরো সেবাটিকে সময়ের সঙ্গে আরও উন্নত করতে হবে। অতীতে কিছু সেবা উদ্বোধনের ছয় মাস পর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমনটি হতে দেবে না।

বিআরটিসি ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়েল কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, মঙ্গলবার যে সেবা শুরু হলো, দুই মাস পর এর মান আরও বাড়াতে হবে। বিদ্যমান লজিস্টিক সহায়তা ও জনবল হয়তো নতুন ব্যবস্থার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নাও থাকতে পারে, তবে প্রতিদিন ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে হবে।

নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াতের পরিবেশ তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সরকার করবে এবং মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দায়বদ্ধ থাকবে। এই উদ্যোগকে টেকসই করা, আরও সমৃদ্ধ করা এবং বিস্তৃত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

মন্ত্রী আরও বলেন, নারী যাত্রীদের জন্য বাসের ওঠার আগের অপেক্ষার সময় থেকে শুরু করে বাসে ওঠা এবং বাস থেকে নামা পর্যন্ত পুরো যাত্রাটিই নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করতে হবে। অনেক সময় অপেক্ষার সময় নারীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, বাসের ভেতরেও ব্যবস্থাপনার কারণে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। আবার বাস থেকে নামার সময়ও অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি হতে দেখা যায়। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। রাষ্ট্র বিনির্মাণে যেমন তাদের অবদান রয়েছে, তেমনি ভোটারদেরও অর্ধেকের বেশি নারী। পাশাপাশি পরিবারের অর্থনীতিতেও নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই নারীদের সক্ষমতাকে রাষ্ট্রের কাজে পুরোপুরি ব্যবহার করতে হলে তাদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা জরুরি।

যেসব রুটে চলছে পিংক বাস
বিআরটিসি জানিয়েছে, নারীবান্ধব ও নারী চালক দ্বারা পরিচালিত পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকারের অংশ। এর অংশ হিসেবে মোট ১৪টি বিশেষ বাস দিয়ে এই সেবা শুরু হয়েছে:

ঢাকা: ১০টি রুটে ১০টি বাস (১টি একতলা ও ৯টি দ্বিতল)।

চট্টগ্রাম: ২টি রুটে ২টি বাস।

বগুড়া: ২টি রুটে ২টি বাস।

বিআরটিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম জানান, সংস্থাটি বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বা তার বেশি বাস পরিচালনা করছে। বর্তমানে বিআরটিসি লোকসানে নেই, বরং ব্রেক-ইভেন অবস্থায় রয়েছে। তবে মানসম্মত সেবা ও অপারেশনে সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যমান জরাজীর্ণ ব্যবস্থাপনাকে সময়ের সঙ্গে ঢেলে সাজিয়ে যুগোপযোগী ও যাত্রীবান্ধব করতে হবে।

ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, অনেক রুটের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও সেসব রুটের পারমিট রয়েছে। আবার অনেক রুটে পারমিট না থাকলেও বাস চলছে। অনেক আগে নির্ধারিত এসব রুট এখন যাত্রীদের চাপ ও প্রয়োজন বিবেচনা করে নতুন করে নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হবে।

পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরাসরি আমদানির মাধ্যমে ২০০টি ইলেকট্রিক বাস (ই-বাস) কেনার প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথা জানান শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে ই-বাস কেনার ক্ষেত্রে অনুমোদন, দরপত্র ও আন্তর্জাতিক ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করতে কমপক্ষে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। এ কারণেই সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাল্টিমোডাল যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ই-বাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা সরকারের অঙ্গীকারের অংশ।

তিনি জানান, সংগৃহীত ২০০টি ই-বাসের মধ্যে ১০০টি নারীদের জন্য বিভিন্ন রুটে রাখা হবে। এর ফলে নারী বাসসেবার রুট ও বাসের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতে এই সেবা অন্যান্য বিভাগেও সম্প্রসারণ করা হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আব্দুল লতিফ মোল্লা।

যেসব রুটে চলবে

প্রাথমিকভাবে ঢাকার বিভিন্ন ডিপোর অধীনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুটে এ বাস চলবে। মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, মিরপুর, জোয়ারসাহারা ও গাজীপুর ডিপোর মাধ্যমে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নারীদের জন্য পৃথক এই বাস পরিচালনা করা হবে।

মতিঝিল ডিপোর একটি রুটে কোকা-কোলা, নতুনবাজার, উত্তর ও মধ্য বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত বাস চলবে। একই ডিপোর আরেকটি রুট তালতলা, খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, বৌদ্ধমন্দির, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, আরামবাগ, শাপলা চত্বর ও সচিবালয় হয়ে মতিঝিলে পৌঁছাবে।

যাত্রাবাড়ী ডিপোর বাস ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, বাঁশের পুল, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, পল্টন, সচিবালয় ও মৎস্য ভবন হয়ে জিপিও পর্যন্ত চলাচল করবে।

মোহাম্মদপুর ডিপোর বাস মোহাম্মদপুর, শংকর, ধানমণ্ডি-১৫, সিটি কলেজ, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ ও পল্টন হয়ে মতিঝিলে যাবে।

কল্যাণপুর ডিপোর রুটে মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কলাবাগান, শাহবাগ ও পল্টন হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল করবে।

মিরপুর ডিপোর অধীনে দুটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি রুটে মিরপুর-১২, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল যাবে। অন্য রুটে মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহবাগ ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত চলবে।

জোয়ারসাহারা ডিপোর বাস আবদুল্লাপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, কুড়িল, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিলে পৌঁছাবে।

এছাড়া গাজীপুর ডিপোর বাস গাজীপুর, শিববাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, কলেজগেট, স্টেশন রোড, আবদুল্লাপুর ও আশপুর হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত চলাচল করবে।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামে কালুরঘাট থেকে লালখান বাজার এবং কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা রুটে দুটি করে বাস চলবে। বগুড়ায় শেরপুর থেকে মাটিডালি রুটেও দুটি বাস পরিচালনা করা হবে।

বিআরটিসি বলছে, নারীদের কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার সঙ্গে নিরাপদ সংযোগ গড়ে তুলতেই এ বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী রুট ও বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।