Corporate Sangbad
আইন-আদালত

ইউএনওর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা মামলায় রিভিশন

প্রকাশিত: ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৭:২৬ অপরাহ্ন · সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা আদালত অবমাননার (ভায়োলেশন) মামলার আদেশ চ্যালেঞ্জ করে জেলা জজ আদালতে সিভিল রিভিশন মামলা করা হয়েছে। বুধবার (২৯ জুলাই) ইউএনও বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিন ধার্য করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ২০১৩ সালের জমির মালিকানা সংক্রান্ত ‘অপর প্রকার’ ১৮৪/২০১৩ মামলা এবং মিস ভায়োলেশন মামলা ৩১/২০২৬ অন্য আদালতে স্থানান্তরের আবেদন করলে জেলা জজ আদালত দুটি মামলাই সিরাজগঞ্জ সদর জজ আদালতে স্থানান্তর করেন। ফলে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শাহজাদপুর চৌকি আদালতের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। 

আদালত ও শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৪-৬৫ সালে শাহজাদপুর থানা পরিষদের জন্য প্রায় ১০ একর এবং ১৯৮২-৮৩ সালে থানা কমপ্লেক্সের জন্য আরও প্রায় ৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ একর স্থানীয়দের দখলে চলে গেলেও বাকি সাড়ে ১২ একর উপজেলা প্রশাসনের নামে রয়েছে। ১৯৮৩ সালে উপজেলা চত্বরে প্রায় এক বিঘা জমির ওপর চৌকি আদালতের ভবন নির্মাণ করা হয়। পরে ১৯৯১ সালে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ হলেও ২০১৩ সালে তা পুনরায় চালু হয়। 

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে আদালতের দক্ষিণ পাশের জমিতে উপজেলা পরিষদের আইসিটি ট্রেনিং অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়াকে কেন্দ্র করে আদালতের পক্ষ থেকে ‘অপর প্রকার’ মামলা করা হয় এবং ইউএনওসহ বিবাদীদের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। বর্তমানে ওই ভবনে কার্যক্রম চলছে। 

সম্প্রতি চৌকি আদালতের পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে আদালত ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জেরে ইউএনওর বিরুদ্ধে মিস ভায়োলেশন মামলা করা হয় এবং তাকে ছয় মাস আটক রাখার আবেদনও করা হয়। 

উপজেলা প্রশাসনের অভিযোগ, বুধবার (১৮ জুন) আদালত অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিলেও সেই আদেশের কপি ইউএনওর দপ্তরে পৌঁছায় মঙ্গলবার (৩০ জুন)। এর আগে শনিবার (২১ জুন) জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভা ও উপজেলা বিশেষ সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউএনও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে প্রাচীর নির্মাণকাজ স্থগিত রাখতে বলেন। 

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) আদালতের সেরেস্তাদার ইউএনওর বিরুদ্ধে সিভিল ভায়োলেশন মামলা করেন। শনিবার (১৯ জুলাই) ইউএনও লিখিত আপত্তি দাখিল করে দাবি করেন, সরকারপক্ষকে শুনানির সুযোগ না দিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং যথাযথভাবে নোটিশও সরবরাহ করা হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মামলায় বাদী ও আদালত একই হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। 

এই আপত্তিতে আদালত সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে উল্লেখ করে বিচারক বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ইউএনওকে রবিবার (২৬ জুলাই) ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সময়ের আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর করা হয়। একই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বাদীপক্ষের একতরফা সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। 

উপজেলা প্রশাসনের দাবি, রবিবার (২৬ জুলাই) দেওয়া আদালতের আদেশের কপি তারা মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে হাতে পেয়েছে। এর আগে আবেদন করেও আদেশের কপি পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় মামলাটি জেলা জজ আদালতে স্থানান্তরের আবেদন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে শুনানি শেষে মামলার নথি সিরাজগঞ্জ সদর আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। 

উপজেলা পরিষদের সম্পদ রেকর্ড অনুযায়ী, বর্তমানে চৌকি আদালত ০.৬৫১২ একর জমি ব্যবহার করছে, যা উপজেলা পরিষদের খতিয়ানভুক্ত এবং যার ভূমি উন্নয়ন কর এখনো উপজেলা পরিষদ পরিশোধ করছে। ১৯৮৩ সালের লে-আউট পরিকল্পনায় আদালতের জন্য প্রায় ০.৩৩৪২ একর জমি নির্ধারিত থাকলেও আদালতের সংশোধিত আরজিতে প্রায় ৭.০৬ একর জমির দখল দাবি করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন অফিস ও কোয়ার্টারও আদালতের জমিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। 

অন্যদিকে আদালতের সেরেস্তাদারের আবেদনে বলা হয়েছে, ৬ দশমিক ৬৩০০ একর জমি আদালতের ভোগদখলে রয়েছে এবং ওই জমিতে সরকারি অর্থায়নে নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছিল। আবেদন অনুযায়ী, ইউএনও চিঠি দিয়ে সেই কাজ বন্ধ করায় আদালতের আদেশ অমান্য হয়েছে। এ কারণেই ভায়োলেশন মামলা ও ইউএনওকে শাস্তির আবেদন করা হয়েছে। 

চৌকি আদালত পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন বলেন, ইউএনওর বিরুদ্ধে ভায়োলেশন মামলা আইনসম্মতভাবে হয়েছে এবং আদালত প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট ভবন, পুকুর, কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা আদালতের ব্যবহারে রয়েছে। 

অন্যদিকে জেলা জজ আদালতের জিপি ও উপজেলা প্রশাসনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলীমুল হক বলেন, ২০১৩ সালের মামলাটি মূলত জমির মালিকানা নিয়ে। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি উপজেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ করা এবং এর পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। আদালত আইন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের দাবি করলেও তার সমর্থনে কোনো কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তার জন্য প্রাচীর নির্মাণ করা যেতে পারে, তবে জমির মালিকের অনুমতি নিয়ে তা করা উচিত। 

সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমাদুল হাসান জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার চিঠি পাওয়ার পর নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন অনুমতি পাওয়া গেলে কাজ আবার শুরু হবে। 

এদিকে আদালতের নাজির রবিউল ইসলাম বলেন, আদালতে ১০ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন থাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে গেছে। 

উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারী দাবি করেছেন, আদালতের কর্মচারীরা তাদের অফিস ও কোয়ার্টার ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। অন্যদিকে আদালত পক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো আদালতের দখলভুক্ত।