Corporate Sangbad
নির্বাচিত কলাম

আসছে ইন্ট্রাডে ট্রেডিং: প্রস্তুত তো আমাদের পুঁজিবাজার?

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ২:৩৪ অপরাহ্ন ·

সাইফুল ইসলাম পিপন।।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে শেয়ারের লেনদেন টি+২ এবং টি+৩ ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হয়। অর্থাৎ আজ কোনো শেয়ার কিনলে সেটির প্রকৃত মালিকানা বিনিয়োগকারীর বিও হিসাবে আসে দুই বা তিন কার্যদিবস পর। এই ব্যবস্থায় একই দিনে কেনা শেয়ার আবার একই দিনে বিক্রি করার সুযোগ কার্যত নেই।

কিন্তু স্ক্রিপ্ট নেটিং বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিং চালু হলে পরিস্থিতি বদলে যাবে। একজন বিনিয়োগকারী একই ট্রেডিং দিনের মধ্যে একটি শেয়ার কিনে আবার বিক্রি করতে পারবেন। দিনের শেষে তার মোট ক্রয় ও বিক্রয়ের পার্থক্য হিসাব করে শুধুমাত্র নেট অবস্থান নিষ্পত্তি করা হবে। অর্থাৎ প্রতিটি লেনদেন আলাদাভাবে নিষ্পত্তি না করে দিনের মোট অবস্থান সমন্বয় করা হবে।

এই ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক উন্নত ও উদীয়মান পুঁজিবাজারে বহু বছর ধরে চালু রয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ কিংবা ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি বাজারে ইন্ট্রাডে ট্রেডিং নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়; বরং বাংলাদেশের বাজারকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি প্রচেষ্টা।

তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে- আমাদের বাজার কি মানসিক, প্রযুক্তিগত এবং নিয়ন্ত্রকভাবে এই পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত?

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিনিয়োগকারী মৌলিক বিশ্লেষণের চেয়ে গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউবভিত্তিক তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক গ্রুপের তথ্যে নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন। অনেকের কাছে শেয়ারবাজার এখনও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জায়গা নয়; বরং দ্রুত লাভের একটি মাধ্যম। এই বাস্তবতায় ইন্ট্রাডে ট্রেডিং চালু হলে অনেকেই এটিকে ভুলভাবে "সহজে প্রতিদিন লাভ করার সুযোগ" হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো।

বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান বলছে, ইন্ট্রাডে ট্রেডিংয়ে নিয়মিত লাভ করতে পারেন এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা খুবই সীমিত। অধিকাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পর্যাপ্ত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়েন। কারণ এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ নয়; অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মিনিট কিংবা কয়েক সেকেন্ড।

ইন্ট্রাডে ট্রেডিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পাওয়া। একই শেয়ার দিনে একাধিকবার লেনদেন হওয়ায় বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি বাড়ে। বিড-আস্ক স্প্রেড কমতে পারে, প্রাইস ডিসকভারি প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা দ্রুত পজিশন পরিবর্তনের সুযোগ পান। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং মার্কেট মেকার্সদের জন্যও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও সমানভাবে বাড়ে।

দামের ক্ষুদ্র ওঠানামাকেও কাজে লাগানোর প্রবণতা তৈরি হলে অস্বাভাবিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। উচ্চ গতির লেনদেনকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু গোষ্ঠী কৃত্রিমভাবে দাম ওঠানামার চেষ্টা করতে পারে। গুজবভিত্তিক ট্রেডিং, অ্যালগরিদমিক সুবিধার অপব্যবহার, স্পুফিং, লেয়ারিং কিংবা সমন্বিত কারসাজির মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রকের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে শুধু নতুন সুবিধা চালু করাই যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে সমানতালে নজরদারি ব্যবস্থাও আধুনিক করতে হবে।

এখানেই বিএসইসি, ডিএসই, সিডিবিএল, স্টক ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর প্রস্তুতির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। উন্নত সার্ভেইলেন্স সিস্টেম, রিয়েল-টাইম মনিটরিং, অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তকরণ, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ব্রোকারদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিস্তৃত প্রশিক্ষণ- সবকিছু নিশ্চিত না করে শুধুমাত্র নীতিগত অনুমোদন দিয়ে এই ব্যবস্থা চালু করা উচিত হবে না।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইন্ট্রাডে ট্রেডিং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প নয়। এটি একটি বিশেষায়িত ট্রেডিং কৌশল, যেখানে বাজার বিশ্লেষণ, চার্ট পড়া, ভলিউম বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্টপ-লস ব্যবহার এবং কঠোর মানসিক নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। আবেগ, লোভ বা ভয় নিয়ে এই বাজারে প্রবেশ করলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও কিছু বিষয় আগে থেকেই মনে রাখা প্রয়োজন। প্রথমতঃ ঋণ নিয়ে বা প্রয়োজনীয় পারিবারিক অর্থ দিয়ে ইন্ট্রাডে ট্রেডিং করা উচিত নয়। দ্বিতীয়তঃ প্রতিটি লেনদেনের আগে সম্ভাব্য ক্ষতির সীমা নির্ধারণ করতে হবে। তৃতীয়তঃ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অচেনা ব্যক্তির তথাকথিত "হট টিপস"-এর ওপর নির্ভর করে লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। চতুর্থতঃ প্রতিদিন ট্রেড করতেই হবে- এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো সুযোগ না থাকলে বাজারের বাইরে থাকাও একটি ভালো সিদ্ধান্ত।সবচেয়ে বড় কথা, ইন্ট্রাডে ট্রেডিং মানেই প্রতিদিন লাভ নয়। বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে স্ক্রিপ্ট নেটিং বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিং অবশ্যই একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এই সংস্কারের সফলতা নির্ভর করবে কত দ্রুত এটি চালু হলো তার ওপর নয়; বরং কতটা নিরাপদ, স্বচ্ছ ও প্রস্তুত পরিবেশে এটি বাস্তবায়িত হলো তার ওপর।

কারণ একটি আধুনিক বাজারের পরিচয় শুধু নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে উদ্ভাবন ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষা- দুটিই সমান গুরুত্ব পায়। যদি যথাযথ প্রস্তুতি, কার্যকর নজরদারি এবং বিস্তৃত বিনিয়োগ শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে স্ক্রিপ্ট নেটিং বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। আর যদি প্রস্তুতির ঘাটতি থাকে, তবে এই সম্ভাবনাময় সংস্কারই আবার নতুন ঝুঁকির সূচনা করতে পারে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল বাস্তবায়ন। কারণ বাজারের গতি যত বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার প্রয়োজনও তত বাড়বে।

লেখক: মোঃ সাইফুল ইসলাম (পিপন), পুঁজিবাজার বিশ্লেষক।