Corporate Sangbad
নির্বাচিত কলাম

জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যু : প্রজ্ঞাবান রাজনীতিকের বিদায়

প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫২ অপরাহ্ন ·

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি, সংসদীয় গণতন্ত্র ও আইন অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, ৫২’র ভাষা আন্দোলনের সৈনিক, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ইন্তেকালে জাতি একজন অভিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী রাজনীতিককে হারালো। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করলো। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, দক্ষ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমিককে হারাল।

আজকের বাংলাদেশে জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন এমন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি ব্যক্তিগত সততা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি অবিচল আস্থা রেখেই দীর্ঘ সময় দেশের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি সংযম, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। পরষ্পর বিরোধী  রাজনৈতিক পরিবেশেও তিনি যুক্তি, শালীনতা ও সহনশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন সকল সময়, যা তাঁকে প্রায় সকল মহলে সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তার আদর্শ, প্রজ্ঞা, সততা ও কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

জমির উদ্দিন সরকার ১ ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স একজন জোতদার ছিলেন। জমির উদ্দিন সরকার ১৯৪৫ সালে ছাত্র থাকা অবস্থায় তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। পরে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সমর্থক ছিলেন। তিনি আওয়ামী মুসলিমের লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মাওলানা ভাসানীর সহচর ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের অবদান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সেই গুটিকয়েক আইনজীবীর একজন ছিলেন, যারা সরাসরি দেশের জন্য অবদান রেখেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আইনজীবীদের সংগঠিত করার পাশাপাশি তিনি স্বাধীনতার চেতনা ও আইনি লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশীদার ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রথম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করেন। দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও পরামর্শ নবীন ও প্রবীণ উভয় প্রজন্মের নেতাকর্মীদের কাছে সমানভাবে মূল্যবান ছিল।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তিনি বিভিন্ন সময়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিনিষ্ঠা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। একজন মন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ২০০৬ সালে বিএনপির সেই সরকারের মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। জরুরি অবস্থার সেই সময় পেরিয়ে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন হয় এবং তাতে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নবম সংসদের নতুন সদস্যদের জমির উদ্দিন সরকারই শপথ পড়ান। নতুন স্পিকারের দায়িত্বগ্রহণের মধ্য দিয়ে ওই বছর ২৫ জানুয়ারি জমির উদ্দিন সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়।

তার লেখা বইয়ের মধ্যে আছে ‘গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’, ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’, ‘লন্ডনে শিক্ষা জীবন’, ‘দি ল অব দি সি’, ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি’, ‘পল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন’, ‘ল অব দি ইন্টারন্যাশনাল রিভারস অ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্স’।

২০০১ সালে জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সংসদ পরিচালনায় দক্ষতা, ধৈর্য ও সাংবিধানিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন। তাঁর সময়ে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় শৃঙ্খলা, মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্পিকার হিসেবে তিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদের মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন।
২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর তিনি ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল সেই সময়ে তিনি সংবিধানের আলোকে দায়িত্ব পালন করে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাজনীতির পাশাপাশি আইন অঙ্গনেও তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রবীণ আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত আদালতে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁর কর্মনিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব এবং আইনের শাসনের প্রতি গভীর অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ। তাঁর পেশাগত জীবন নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার সংগ্রামী জীবন আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষার বিষয় হলো, জনসেবা কেবল একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ এবং দলীয় পরিচয়ের চেয়ে সাংবিধানিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়া।

ন্যায়বিচার, সততা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তাঁর মৃত্যুতে শুধু তাঁর পরিবার বা রাজনৈতিক সহকর্মীরাই নন, সমগ্র দেশ একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রচিন্তক, দক্ষ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং নীতিবান আইনজ্ঞকে হারাল। তিনি তাঁর কর্ম, আদর্শ ও অবদানের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

[লেখক : এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া, কলাম লেখক, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক কর্মী]