Corporate Sangbad
অর্থ-বাণিজ্য

২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণে কার্বন বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ৪:০৯ অপরাহ্ন ·

দেশব্যাপী সরকারের ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উৎপাদিত কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করতে পারে। 'জলবায়ু অর্থায়ন বাজেট প্রতিবেদন'-এ এই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে, গত ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই বৃহৎ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পাঁচ বছর মেয়াদি উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৃহৎ পরিসরের বনায়নের মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট উৎপাদনের সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত রোপণ এলাকা আগেই সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কাছে নিবন্ধন ও প্রতিবেদন আকারে দাখিল করতে হয়। বৃক্ষের মাধ্যমে কার্বন শোষণ বৃদ্ধি এবং নিট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের মাধ্যমে এই উদ্যোগ কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক লাভ এনে দিতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করতে সক্ষম হবে।

অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি এই উদ্যোগে পরিবেশগতভাবেও বড় সুফল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রা হ্রাস, বৃষ্টিপাতের ধরন স্বাভাবিক রাখা, মাটির গুণগত মান ও বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) সহনশীলতা বৃদ্ধি। ফলে এই কর্মসূচি টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সবুজ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (Green Economic Growth) নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক কার্বন মূল্য নির্ধারণ বাজার থেকে আয় দাঁড়িয়েছে ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় বাস্তব মূল্যে প্রায় ২ শতাংশ বেশি। বর্তমান বৈশ্বিক বাজার সক্ষমতা প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই খাতে প্রধান বিনিয়োগটি আসবে বেসরকারি খাত থেকে। তবে এই অতিরিক্ত বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে দেশগুলোকে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রমাণযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে হবে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম কম মাথাপিছু গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হওয়ায়, কার্বন হ্রাস কর্মসূচি সঠিকভাবে নকশা ও বাস্তবায়ন করা গেলে বৈশ্বিক কার্বন বাণিজ্য থেকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নিতে প্রস্তুত নয় বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। এর প্রধান ঘাটতিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

প্যারিস চুক্তির 'আর্টিকেল ৬' ব্যবস্থা সম্পর্কে সীমিত প্রযুক্তিগত জ্ঞান।

কার্বন ক্রেডিট ইস্যু ও বাণিজ্যের জন্য দুর্বল আইনগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো।

এমআরভি (Monitoring, Reporting, and Verification) ও প্রকল্প সনদায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা।

এই ঘাটতিগুলো দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কার্বন ক্রেডিট কী ও বাংলাদেশের পূর্ব অভিজ্ঞতা
একটি কার্বন ক্রেডিট হলো এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা তার সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস, অপসারণ বা প্রতিরোধের একটি যাচাইকৃত একক। সাধারণত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, বনায়ন এবং মিথেন নিয়ন্ত্রণের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে এটি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রিত বা স্বেচ্ছা কার্বন বাজারে কেনাবেচা করা যায়। এটি মূলত বিভিন্ন সরকার, প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিকে তাদের নির্গমনের ক্ষতিপূরণ করতে অন্যদের কাছ থেকে যাচাইকৃত নির্গমন হ্রাস ইউনিট ক্রয়ের সুযোগ দেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল ৬ এবং শক্তিশালী এমআরভি (MRV) ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়।

কার্বন বাজারে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একেবারে নতুন নয়। ২০০৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডিসিওএল) জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সংস্থায় দেশের প্রথম ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (সিডিএম) প্রকল্প নিবন্ধন করে। এরপর থেকে সৌরবিদ্যুৎ ও উন্নত চুলা প্রকল্প থেকে আইডিসিওএল ২.৫৩ মিলিয়ন কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করেছে, যার মাধ্যমে আয় হয়েছে ১৬.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যা প্রায় ১৭০ কোটি টাকা)।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতীতের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কার্বন প্রকল্প উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ দেয় এবং আগামীতে কার্বন বাজারে অংশগ্রহণ সম্প্রসারণের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি তৈরি করবে।