বাংলাদেশীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।
দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দুই নেতা এই যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। শুরুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বক্তব্য রাখেন। পরে তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের নানা দিক ও অগ্রগতির বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করেছি। এর পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটকে থাকা বাংলাদেশীদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুই দেশই একমত হয়েছি যে, শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী হতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে এবং শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় হ্রাস পায়।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানোর জন্য আনোয়ার ইব্রাহিমকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ সফরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।’
স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৯ সালে আমার পিতা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছিল এবং শ্রম সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। একই সঙ্গে আমি আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথাও স্মরণ করছি, যা আমাদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করেছিল।’
দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্য সংযোজন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে।’

মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের বিপুল সমর্থন পেয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। আমরা একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছি।’
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। এছাড়া বাংলাদেশ আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হতে এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে (আরসিইপি) যোগদানে মালয়েশিয়ার সমর্থন কামনা করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় তিনি মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান।
বৈঠক শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতি বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বিনিময় করা হয়। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই দলিলগুলো বিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান।
এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান, বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।