দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বর্তমান সরকারের প্রথম এই বাজেটটি পেশ করবেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র মহাসড়কে এগিয়ে নেওয়া।
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রচলিত অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাজেটের কিছু উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবনা:
এসএমই ও উদ্যোক্তা তহবিল: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে।
বেতন কাঠামো: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা আসতে পারে।
ই-হেলথ কার্ড: প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বেশ কিছু নতুন কর্মসূচি যুক্ত হচ্ছে, পাশাপাশি বাড়ছে বিদ্যমান খাতের বরাদ্দও।
যুব উন্নয়ন: যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব থাকছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান: বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। এছাড়া মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে মেটানো হবে। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ।
এবারের বাজেটের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ বা ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসার যাবতীয় সেবা মিলবে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই।
পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমকে পুরোপুরি অনলাইননির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কর রিফান্ড (ফেরত) এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আইনি প্রস্তাব আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি সঞ্চার করা না গেলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
তবে সরকারের নীতিপ্রণেতারা আশাবাদী। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, "সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।"
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ থাকলেও, চলমান কাঠামোগত সংস্কারগুলো দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।